×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অস্থিরতার মধ্যেও কেন মার্কিন বন্ডবাজারে আগ্রহ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের?

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ১৩:৩০:১৫
অস্থিরতার মধ্যেও কেন মার্কিন বন্ডবাজারে আগ্রহ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন বন্ডবাজারে সাম্প্রতিক দরপতনকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। মূল্যস্ফীতি, তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সুদহার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড বেড়েছে। এতে পুরোনো বন্ডের দাম কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন তুলনামূলক কম দামে বন্ড কেনার সুযোগ খুঁজছেন।

বন্ডবাজারে দাম ও ইয়েল্ডের সম্পর্ক সাধারণত বিপরীতমুখী। অর্থাৎ বাজারে ইয়েল্ড বাড়লে বিদ্যমান বন্ডের দাম কমে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড বৃদ্ধির ফলে পুরোনো বন্ডের মূল্য কমেছে। এই পরিস্থিতিই কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে নতুন করে বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড। গত সপ্তাহে এ বন্ডের ইয়েল্ড ৪ দশমিক ৮ শতাংশের ওপরে উঠে যায়, যা ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। ৮ সেপ্টেম্বরও ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারির ইয়েল্ড প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশে অবস্থান করছিল।

বাজারের একটি অংশের ধারণা, ইয়েল্ড আরও বাড়লে ট্রেজারি বন্ডের দাম আরও কমতে পারে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউ একবারে বড় অঙ্কের অর্থ না ঢেলে ধাপে ধাপে বন্ড কেনার পরিকল্পনা করছেন।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের ভবিষ্যৎ গতিপথ এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে ইয়েল্ড আরও বাড়লে বর্তমানে কেনা বন্ডের দাম সাময়িকভাবে আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বন্ডবাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতায় ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার নীতি বড় ভূমিকা রাখছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানের তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হওয়ার পর বাজারে নতুন করে সুদহার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ বলে বিবেচনা করছেন ট্রেডাররা।

সুদের হার বাড়লে নতুন ইস্যু করা বন্ডে তুলনামূলক বেশি রিটার্ন পাওয়া যায়। এতে আগে ইস্যু হওয়া কম সুদের বন্ডের আকর্ষণ কমে যায় এবং বাজারে সেগুলোর দামও সাধারণত নিচের দিকে চলে আসে। ফলে ফেডের সিদ্ধান্ত এখন বন্ড বিনিয়োগকারীদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে উচ্চ সুদহারের ঝুঁকি এড়াতে সবাই দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে ঝুঁকছেন না। অনেক বিনিয়োগকারী স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি এবং মূল্যস্ফীতি-সুরক্ষিত বন্ড বা টিআইপিএসের দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা একদিকে উচ্চ ইয়েল্ডের সুবিধা নিতে চাইছেন, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সুদহার পরিবর্তনের ঝুঁকি সীমিত রাখার চেষ্টা করছেন।

বন্ডভিত্তিক বিভিন্ন ফান্ডেও সাম্প্রতিক সময়ে অর্থপ্রবাহ বেড়েছে। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি বন্ড ও ট্রেজারি ইনফ্লেশন-প্রটেক্টেড সিকিউরিটিজের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীদের এই আচরণ থেকে বোঝা যায়—উচ্চ ইয়েল্ড তাদের আকৃষ্ট করছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিতে তারা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নন।

এর বাইরে মার্কিন বন্ডবাজারে দীর্ঘদিনের আরেকটি প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে—যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সরকারি ঋণ শেষ পর্যন্ত কারা কিনবে। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মার্কিন ট্রেজারি কেনার প্রবণতা নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা যদি বেশি রিটার্ন দাবি করেন, তাহলে নতুন ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বাড়বে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্ড ইয়েল্ড বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণের চাপ এবং নতুন করে ঋণ ইস্যুর বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মার্কিন বন্ডের ইয়েল্ডের পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেজারি বন্ডে রিটার্ন বাড়লে বিশ্ববাজারে ডলারভিত্তিক সম্পদের আকর্ষণ বাড়তে পারে। এর ফলে উদীয়মান বাজার থেকে কিছু বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদে স্থানান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তবে একই পরিস্থিতি বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। উচ্চ ইয়েল্ডে এখন বন্ড কিনে পরবর্তী সময়ে সুদহার কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা সুদ আয়ের পাশাপাশি বন্ডের দাম বাড়ার ফলে মূলধনী লাভও পেতে পারেন।

সবশেষে, মার্কিন বন্ডবাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে মূল্যস্ফীতি, তেলের দাম, ফেডের সুদহার নীতি এবং সরকারের ঋণের গতিপথের ওপর। এসব সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এলে বর্তমান উচ্চ ইয়েল্ডে কেনা ট্রেজারি বন্ড ভবিষ্যতে আকর্ষণীয় রিটার্ন দিতে পারে। তাই অস্থিরতার মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুই দিক বিবেচনা করে ধীরে ধীরে বাজারে অবস্থান নেওয়ার কৌশল অনুসরণ করছেন।

এমজে/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে