ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬

শেয়ারবাজার উত্থানের নেতৃত্বে মিউচুয়াল ফান্ড

২০২৬ আগস্ট ০৬ ০৬:১১:২৯
শেয়ারবাজার উত্থানের নেতৃত্বে মিউচুয়াল ফান্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক: মিউচুয়াল ফান্ডে চোখে পড়ার মতো মূল্যবৃদ্ধি, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ইতিবাচক আর্থিক ফলাফল এবং সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপে জুলাই মাসেও ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রেখেছে দেশের শেয়ারবাজার। এর ফলে টানা চতুর্থ মাসের মতো মূল্যসূচকের উত্থান হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই)। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের শেয়ারবাজারের তুলনায় ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

শেলটেক ব্রোকারেজ লিমিটেডের মাসিক বাজার পর্যালোচনা অনুযায়ী, জুলাই মাসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স (ডিএসইএক্সDSEX) ১৩২ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৮৯৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ব্লু-চিপভিত্তিক ডিএস-৩০ সূচক ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ২১৭ পয়েন্ট এবং শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ২ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১৯৫ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।

বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। জুলাই মাসে দৈনিক গড় লেনদেন আগের মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সঙ্গে দৈনিক গড় শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়ে ৪২ কোটি ৫৫ লাখ শেয়ারে উন্নীত হয়।

মিউচুয়াল ফান্ডে সর্বোচ্চ উত্থান

জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে। এ খাতের বাজার মূলধন প্রায় ২২ শতাংশ বেড়েছে, যা সব খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।

শেলটেক ব্রোকারেজ বলছে, দীর্ঘদিন অবহেলিত মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে পুনর্গঠনে সরকারের উদ্যোগের প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে ইউনিট কিনেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ফান্ডের মূল্যায়ন উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও এ খাতে আগ্রহ বাড়িয়েছে।

এর প্রভাব লেনদেনেও দেখা গেছে। জুলাই মাসে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দৈনিক গড় লেনদেন আগের মাসের তুলনায় ১৮৯ শতাংশ বেড়ে ৪২ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।

তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, যার ইউনিট মূল্য ৯১ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্য বেড়েছে ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ, এনসিসিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ানের ৬৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং পিএফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ৬২ দশমিক ৫০ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর রেয়াত পাওয়ার জন্য বিনিয়োগের ন্যূনতম ৫ লাখ টাকার শর্ত তুলে দেওয়াও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

বেশিরভাগ খাতেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা

মিউচুয়াল ফান্ডের পাশাপাশি বস্ত্র খাতের শেয়ারদর বেড়েছে ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ। এছাড়া খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ, পাট খাতে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ভ্রমণ ও অবকাশ খাতে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, ট্যানারি খাতে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খাতে ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।

লেনদেনের দিক থেকেও বস্ত্র খাত শীর্ষে ছিল। মোট লেনদেনের ১৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ হয়েছে এ খাতে। এরপর বীমা খাতের অংশ ছিল ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ওষুধ ও রসায়ন খাতের অংশ ছিল ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি নির্দিষ্ট শেয়ারের ওপর নির্ভর না করে অধিকাংশ খাতে একযোগে মূল্যবৃদ্ধি হওয়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসার ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।

আঞ্চলিক বাজারের তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ

বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও জুলাই মাসে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি বাজারকে ছাড়িয়ে গেছে।

এ সময়ে ইন্দোনেশিয়ার আইডিএক্স কম্পোজিট সূচক ১০ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ার এফটিএসই বুরসা মালয়েশিয়া কেএলসিআই ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে বাংলাদেশের ডিএসই ভারতের সেনসেক্সের (২ দশমিক ১১ শতাংশ) এবং থাইল্যান্ডের এসইটি সূচকের (২ দশমিক ৪ শতাংশ) চেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল।

অন্যদিকে পাকিস্তানের কেএসই-১০০ সূচক ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার অল শেয়ার প্রাইস ইনডেক্স ৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ভিএন-ইনডেক্স ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমেছে।

সংস্কার ও সুদহার কমানোর ইতিবাচক প্রভাব

পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকারের ঘোষিত ১৭ দফা রোডম্যাপ বাজারে নতুন আস্থা তৈরি করেছে। এ ঘোষণার পর ডিএসইএক্স সূচক প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৯২৬ দশমিক ২৮ পয়েন্টে ওঠে। একই সময়ে দৈনিক লেনদেনও দুই বছরের সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকায় পৌঁছে।

রোডম্যাপে দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, ডিজিটাল ট্রেডিং, বন্ডবাজার সম্প্রসারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার তদারকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর বার্তা দিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ট্রেজারি সিকিউরিটিজের সুদহার কমে আসা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়ার কারণে শেয়ারবাজার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

করপোরেট মুনাফায় জোরালো আস্থা

জুলাই মাসে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা ৮৯টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ৬৫টির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।

বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে বেশি আয় করেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানিও শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করায় ব্লু-চিপ শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ে।

শেলটেক ব্রোকারেজের মতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ট্রেজারি আয় বাড়ানোর মাধ্যমে অনেক কোম্পানি প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও ভালো ফলাফল করতে সক্ষম হয়েছে।

এখন নজর নতুন সংস্কারে

বাজারসংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি এখন সংশোধিত মার্জিন ঋণ নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদনের দিকে। পাশাপাশি জুন সমাপ্ত অর্থবছরের কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড ঘোষণা ও বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে