ঢাকা, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

সংসদে ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরি নিয়ে বিতর্ক

২০২৬ জুন ২৭ ১৯:৫৮:১০
সংসদে ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরি নিয়ে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরির সুযোগ দেওয়া হয় না, যা বৈষম্যমূলক ও অন্যায়। তবে তার এই বক্তব্যের জোরালো প্রতিবাদ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। তিনি দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষই কর্মরত রয়েছেন।

শনিবার (২৭ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে দুই নেতার মধ্যে এ বিতর্কের সূচনা হয়।

বিতর্কের সূত্রপাত হয় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থর বক্তব্য থেকে। বাজেট আলোচনায় তিনি দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ও যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি সম্প্রসারণের পক্ষে মত দেন। ইসলামী ব্যাংকিংকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় একটি ব্যবস্থা উল্লেখ করে তিনি ধীরে ধীরে সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রস্তাবও তুলে ধরেন।

পরে বক্তব্য দিতে গিয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আন্দালিব রহমান পার্থ অর্থনীতি নিয়ে সুন্দর বক্তব্য দিয়েছেন এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপির আদর্শ ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তবে তা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য নয়; বরং সব ধর্মের মানুষের মূল্যবোধের প্রতি সমান সম্মান প্রদর্শনের কথা বলে।

এরপরই তিনি ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরি না হওয়ার অভিযোগ তোলেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে গয়েশ্বর বলেন, তিনি একবার একটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালককে একজনের চাকরির জন্য অনুরোধ করেছিলেন। নাম পাঠানোর পর পরিচালক তাকে জানান, প্রার্থী হিন্দু হওয়ায় তাকে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়।

গয়েশ্বর রায় বলেন, একটি ব্যাংক কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা নয়। সেখানে ধর্মের ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ সীমিত থাকলে তা বৈষম্য ও অন্যায়ের শামিল। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শুধু মুসলমানদের জন্য স্বাধীন হয়নি; সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাশাপাশি তিনি ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী বিমা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

গয়েশ্বর রায়ের বক্তব্যের পর সংসদে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি অমুসলিমদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তার জানা মতে, ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরি করার ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই এবং যে কেউ সেখানে কাজ করতে পারেন।

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিয়ে সতর্ক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সংসদে অনেক সময় অনুমাননির্ভর বক্তব্য দেওয়া হয়। যেহেতু এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, তাই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকা উচিত।

পরে আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী গয়েশ্বর রায়ের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকে চাকরি সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। তার নিজের এলাকাতেই বহু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন।

এর আগে বাজেট আলোচনায় আন্দালিব রহমান পার্থ মদিনা সনদের আদলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্র ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল এবং সেই আদর্শ অনুসরণ করেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বাজেটে এতিম, নারী, বঞ্চিত ও শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি দেশের মেধাবী তরুণদের বিকাশের জন্য আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে জাতীয় ক্রিকেটার নাহিদ রানার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আরও অসংখ্য প্রতিভা উঠে আসবে।

যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, যাকাত দরিদ্র মানুষের জন্য একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এজন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় যাকাতগ্রহীতাদের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা উচিত, যাতে দেশ-বিদেশের যাকাতদাতারা সহজেই প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে পারেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আদলে বাংলাদেশেও যাকাতভিত্তিক একটি টিভি চ্যানেল চালুর প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ধীরে ধীরে নিরুৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। একটি ইসলামী ব্যাংকে অনিয়ম ঘটেছে মানেই ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যর্থ—এমনটি মনে করার সুযোগ নেই।

আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে পার্থ দাবি করেন, বর্তমান সরকারের চার মাসে খুন বা ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটলেও বড় ধরনের আর্থিক লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম ছয়-সাত মাসেই বেসিক ব্যাংকের মতো বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির সূচনা হয়েছিল।

সবশেষে ভোলার গ্যাসক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে শিল্পায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। ভোলায় বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ভোলা দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চলে পরিণত হতে পারে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পৃথক একটি কমিটি গঠনেরও দাবি জানান তিনি।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে