ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

ডিএসইর ইতিহাসে নজিরবিহীন ছাঁটাই, ক্ষোভ ও উদ্বেগে কর্মকর্তারা

২০২৬ জুন ২৫ ২১:২৬:৫০
ডিএসইর ইতিহাসে নজিরবিহীন ছাঁটাই, ক্ষোভ ও উদ্বেগে কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে একদিনে চারজন উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ একাধিক কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আকস্মিক এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ, কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ডেকে এনে চাকরি অবসানের চিঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে ডিএসইর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার পদক্ষেপ নয়। বরং প্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি ‘রিসোর্স অপটিমাইজেশন’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ডিএসই সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেনারেল অ্যাডমিন বিভাগের ডিজিএম মো. আব্দুল লতিফ ও হোসনে আরা পারভীন, আইসিটি বিভাগের ডিজিএম শাহিন সারওয়ার এবং ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ডের সমন্বয়ক ডিজিএম আব্দুর রাজ্জককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুজন সিনিয়র ম্যানেজার এবং নিম্নপদে কর্মরত আরও দুজন কর্মকর্তাকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

সূত্র আরও জানিয়েছে, এ তালিকায় আরও কিছু কর্মকর্তা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বর্তমানে ডিএসইর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের একজনকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএসইর জনবল পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তার চাকরি তাৎক্ষণিকভাবে অবসান করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান প্রয়োজন বিবেচনায় তার পদটি আর প্রয়োজনীয় নয় বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।

চিঠি অনুযায়ী, চাকরি অবসানের পর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ১২০ দিনের সমপরিমাণ মোট বেতন নোটিশের পরিবর্তে পাবেন। এছাড়া চলতি মাসের বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রাপ্য অর্থ, গ্র্যাচুইটি, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ ও ডব্লিউডব্লিউএফ) থেকে পাওনা, অব্যবহৃত বার্ষিক ছুটির নগদ মূল্য এবং ডিএসইর নীতিমালা অনুযায়ী অন্যান্য সুবিধাও পরিশোধ করা হবে।

এর পাশাপাশি সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে অতিরিক্ত দুই মাসের সমপরিমাণ মোট বেতন দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এ সুবিধা সম্পূর্ণভাবে ডিএসইর বিবেচনাধীন এবং এটি কোনো ধরনের আইনি অধিকার বা ভবিষ্যৎ নজির হিসেবে গণ্য হবে না।

চূড়ান্ত পাওনার হিসাব প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সরবরাহ করা হবে এবং হিসাব পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে আপত্তি না জানালে সেটি চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। প্রযোজ্য কর, অগ্রিম, ঋণ কিংবা অন্য কোনো দায় সমন্বয়ের পর চাকরি অবসানের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে চেকের মাধ্যমে সব পাওনা পরিশোধ করা হবে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, চাকরি অবসানের দিনই পরিচয়পত্র, ভিজিটিং কার্ড, অফিস নথি এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সম্পদ ও গোপনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে হস্তান্তর করতে হবে। চাকরি শেষ হলেও গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ না করার বাধ্যবাধকতা বহাল থাকবে।

ডিএসইর এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে আগে কখনো এভাবে কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। হঠাৎ ডেকে এনে চাকরি না থাকার চিঠি ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অধিকাংশ কর্মকর্তা আতঙ্কে রয়েছেন। কে কখন চাকরি হারান, সেই উদ্বেগ এখন সবার মধ্যে কাজ করছে।

চাকরিচ্যুত ডিজিএম মো. আব্দুল লতিফ বলেন, আমাকে অব্যাহতির চিঠিতে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা সাজাতে চায়। যারা তাদের মত অনুযায়ী কাজ করবে, তাদেরই রাখতে চায়। এখন এ বিষয়ে আমার আর কিছু বলার নেই। আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমি সবসময় আইনের মধ্যে থেকেই তা পালনের চেষ্টা করেছি।

তিনি আরও বলেন, আমি ২১ বছর ধরে ডিএসইতে কর্মরত। যোগদানের সময় আমি প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলাম। এত বছরের চাকরিজীবনের পর যদি এমন মূল্যায়ন পাই, তাহলে আর কিছু বলার থাকে না।

চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা হোসনে আরা পারভীন বলেন, চাকরির বিধি অনুযায়ী আমাদের ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ করে চাকরি অবসানের চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমি ৩২ বছর ধরে ডিএসইতে কাজ করছি। বিস্ময়কর বিষয় হলো, চিঠি দেওয়ার আগেই আমার কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অন্য এক চাকরিচ্যুত ডিজিএম, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, আমি প্রায় ৩২ বছর ধরে ডিএসইতে কর্মরত ছিলাম। এর আগে কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ ডেকে নিয়ে গিয়ে চিঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে কী কারণ উল্লেখ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে বলা হয়েছে যে, যে পদের জন্য আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সেই পদ এখন আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটিকে আমি প্রকৃত কারণ বলে মনে করি না। তাদের পছন্দের লোকদের জায়গা করে দিতেই আমাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, এটি কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। ডিএসইকে আরও দক্ষ, আধুনিক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি রিসোর্স অপটিমাইজেশন পরিকল্পনার আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের জনবল কাঠামো আমরা পর্যালোচনা করেছি। বিভিন্ন ধাপে মূল্যায়নের পর পরিচালনা পর্ষদ নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এরপর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, মানবসম্পদ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুসারে পদগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পুরো প্রক্রিয়া আইন, বিধিবিধান এবং অভ্যন্তরীণ নীতিমালা অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে।

মমিনুল ইসলাম আরও বলেন, যেসব পদ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নয় বলে বিবেচিত হয়েছে, কেবল সেসব পদেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এটি কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা বা ব্যক্তিগত কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করার সামগ্রিক উদ্যোগ।

কতজন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট সংখ্যাটি ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি এইচআর কমিটি তদারকি করেছে। পরিচালনা পর্ষদ কেবল নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তাই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এই মুহূর্তে তার কাছে নেই।

ভবিষ্যতে এসব পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, রিসোর্স অপটিমাইজেশনের অংশ হিসেবে যেসব পদকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়েছে, সেগুলোই বিলুপ্ত করা হয়েছে। যদি পদগুলোর প্রয়োজন থাকত, তাহলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো না। ফলে ভবিষ্যতে এসব পদে নতুন নিয়োগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে