ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

দুর্নীতির ধাক্কা কাটিয়ে পুনরুদ্ধারের পথে এনবিএফআই খাত

২০২৬ জুন ২৫ ১২:৪৫:২০
দুর্নীতির ধাক্কা কাটিয়ে পুনরুদ্ধারের পথে এনবিএফআই খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আস্থাহীনতায় ভোগা দেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের পাশাপাশি এ খাতেও সংস্কার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে। এরই প্রতিফলন হিসেবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমানত ও আমানতকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে একই সময়ে ঋণ বিতরণে কিছুটা সংযত অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এনবিএফআই খাতের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৫৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ১২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ৪৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা শতাংশের হিসেবে ০.৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে খাতটিতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৪৮৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯ হাজার ৭৭৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে আমানত হয় ৫০ হাজার ৭২২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং ডিসেম্বর শেষে তা পৌঁছে ৫১ হাজার ১২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকায়। ফলে গত এক বছরে ধারাবাহিকভাবে আমানত বৃদ্ধির প্রবণতা বজায় রয়েছে।

একই সঙ্গে বেড়েছে আমানতকারীর সংখ্যাও। চলতি বছরের মার্চ শেষে এনবিএফআই খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২২ হাজার ৭২৬ জন। এর তিন মাস আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৮২ জন। ফলে এক প্রান্তিকের ব্যবধানে নতুন আমানতকারী যুক্ত হয়েছেন ৫১ হাজার ৩৪৪ জন, যা ৮.৯৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

অতীতের পরিসংখ্যানও একই ধারা নির্দেশ করে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৪০ হাজার ৯০৭ জন। জুন শেষে তা বেড়ে হয় ৪ লাখ ৮০ হাজার ১৬৩ জন। সেপ্টেম্বর শেষে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ লাখ ৪০ হাজার ৮২৫ জন এবং ডিসেম্বর শেষে পৌঁছায় ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৮২ জনে।

অন্যদিকে, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এনবিএফআই খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৭৮ হাজার ৪২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৮ হাজার ৮২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ফলে তিন মাসে ঋণের স্থিতি কমেছে ৪০৪ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা ০.৫১ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।

খাতটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এনবিএফআই খাতের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি বিদ্যমান ঝুঁকিগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমানতের প্রবৃদ্ধি মূলত গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক প্রতিফলন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ধারা ধরে রাখতে হলে খাতটিতে আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিষয়ে খাত বিশ্লেষক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, “এনবিএফআই খাতে আমানত ও আমানতকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসার একটি ইতিবাচক সংকেত। একই সঙ্গে ঋণ বিতরণে কিছুটা কমতি নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ঝুঁকি বিবেচনায় সতর্ক ঋণ বিতরণ ভবিষ্যতে সম্পদের গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “এই ইতিবাচক ধারা টেকসই করতে হলে খাতটিতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ, করপোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা এবং তদারকির ঘাটতি দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে এনবিএফআই খাত আবারও দেশের বিনিয়োগ ও অর্থায়নের অন্যতম শক্তিশালী বিকল্প খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।”

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে