ঢাকা, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

লোকসান, প্রভিশন ঘাটতি ও দুর্বল মূলধন—চ্যালেঞ্জে আইএফআইসি ব্যাংক

২০২৬ জুন ২০ ২০:০৩:৫৬
লোকসান, প্রভিশন ঘাটতি ও দুর্বল মূলধন—চ্যালেঞ্জে আইএফআইসি ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট এবং লোকসানের তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংকটির বহিঃনিরীক্ষক তাদের প্রতিবেদনে ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করে এসব বিষয়ে বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীর বিভিন্ন নোটে ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট প্রভিশন, সাধারণ প্রভিশন, অফ-ব্যালেন্স শিট এক্সপোজারের প্রভিশন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা এফডিআরের বিপরীতে প্রভিশন, মূলধন পর্যাপ্ততা (সিআরএআর) এবং প্রভিশনের আগের মুনাফা-লোকসানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে নিরীক্ষক মতামত পরিবর্তন করেননি।

আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, অশ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে সাধারণ প্রভিশন হিসেবে ২ হাজার ৭০ কোটি ১৬ লাখ টাকার প্রয়োজন ছিল। এর সঙ্গে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হিসাব (এসএমএ) ঋণের জন্য প্রয়োজন ছিল ৬৩১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের জন্য ৬৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ফলে মোট প্রয়োজনীয় সাধারণ প্রভিশনের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৭০১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যাংকটি সংরক্ষণ করেছে ২ হাজার ৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ফলে সাধারণ প্রভিশনে ঘাটতি রয়েছে ৬৯৫ কোটি ৯১ লাখ টাকার।

এ ছাড়া অফ-ব্যালেন্স শিট এক্সপোজারের বিপরীতে ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৯৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। কিন্তু সংরক্ষিত প্রভিশনের পরিমাণ ১ হাজার ১৯২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা এফডিআরের বিপরীতে প্রভিশনে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ খাতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ৩১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি সংরক্ষণ করেছে মাত্র ১৬৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল জারি করা এক বিশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে ঋণ ও অগ্রিম এবং এবি ব্যাংকে স্থাপিত আমানতের বিপরীতে ২ হাজার ১৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকার প্রভিশন তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বয় না করে স্থগিত রাখার সুযোগ দিয়েছে। এই সুবিধার ভিত্তিতেই ব্যাংকটি ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করেছে।

মূলধন পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রেও ব্যাংকটির অবস্থা উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের শেষে আইএফআইসি ব্যাংকের মোট নিয়ন্ত্রক মূলধন ছিল ১ হাজার ৪৭৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে ঝুঁকি-সমন্বিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৬৩১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন ছিল ৫ হাজার ৮৬৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ফলে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৯৮ কোটি ২২ লাখ টাকারও বেশি।

এ অবস্থায় ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৮২ শতাংশে, যেখানে আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। একই সময়ে কমন ইকুইটি টিয়ার-১ অনুপাত ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে কমে ০ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। আর মোট টিয়ার-১ মূলধন অনুপাত দাঁড়িয়েছে ০ দশমিক ৪২ শতাংশ।

আর্থিক ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ব্যাংকের সুদ, লভ্যাংশ, কমিশন, ব্রোকারেজ ও অন্যান্য উৎস থেকে মোট পরিচালন আয় হয়েছে ৩ হাজার ২২৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বিপরীতে সুদ ব্যয়, প্রশাসনিক ব্যয়, পরিচালন ব্যয় ও অবচয়সহ মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৯৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ফলে প্রভিশনের আগে ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আগের বছর একই সময়ে ব্যাংকটি ৫৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকার মুনাফা করেছিল।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকের সঞ্চিত মুনাফা ২০২৪ সালের ২১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত অবস্থা থেকে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৩৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে এসেছে। ফলে শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটির ওপরও উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে।

সার্বিকভাবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, আইএফআইসি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট এবং লোকসান পরিস্থিতি ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ছাড়ের কারণে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়েছে, তবুও ভবিষ্যতে প্রভিশন সংরক্ষণ ও মূলধন শক্তিশালীকরণ ব্যাংকটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে