ঢাকা, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
Sharenews24

ব্যাংক বাঁচাতে ছাপানো টাকা—সমাধান নাকি নতুন ঝুঁকি?

২০২৬ মার্চ ২৯ ১৫:২০:৩৪
ব্যাংক বাঁচাতে ছাপানো টাকা—সমাধান নাকি নতুন ঝুঁকি?

নিজস্ব প্রতিবেদক: ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডজনখানেকের বেশি ব্যাংক থেকে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব লুটপাটে এস আলম গ্রুপসহ কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং গ্রাহকের আমানতের অর্থ ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে ১২টি ব্যাংককে মোট ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ আমলের সর্বশেষ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার-এর সময়ে দেওয়া হয় ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর-এর সময়ে দেওয়া হয় ৫১ হাজার কোটি টাকা। মূলত তিন মাস মেয়াদে দেওয়া এসব ঋণ এক বছর পার হলেও এখনো পরিশোধ হয়নি বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

যেসব ব্যাংক এ সুবিধা পেয়েছে, সেগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ আমলে প্রথম পাঁচটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে। সরকার পরিবর্তনের পর এসব ব্যাংক ওই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয়। এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে ছিল এইচ বি এম ইকবালের পরিবারের।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলো সংকটে পড়েছে—এটি বাস্তবতা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেভাবে টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিচ্ছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। বরং প্রশ্ন উঠেছে—এভাবে আর কতদিন ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। কিছু ব্যাংক একীভূত করা হলেও অগ্রগতি খুবই সীমিত।

সংকটের নেপথ্য চিত্র

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুরবস্থা আড়ালে ছিল। তবে ২০২২ সালের শেষদিকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ্যে এলে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে তারা ব্যাপকভাবে আমানত তুলে নিতে শুরু করে, যা ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটকে তীব্র করে তোলে।

এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো বাধ্যতামূলক নগদ জমা (সিআরআর) ও সরকারি সিকিউরিটিজ (এসএলআর) সংরক্ষণেও ব্যর্থ হয়। এরপরও তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে ব্যাংকগুলোকে সচল রাখেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংক-এ একটি চলতি হিসাব থাকে, যার মাধ্যমে সিআরআর, এসএলআর সংরক্ষণসহ আন্তঃব্যাংক লেনদেন সম্পন্ন হয়। সাধারণত এই হিসাবে ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সংকটকালে শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংকের চলতি হিসাব ঋণাত্মক করে লেনদেন চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়—যা ছিল নজিরবিহীন।

আবারও টাকা ছাপানোর পথে

সরকার পরিবর্তনের পর নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নিয়ে এসব অনিয়ম বন্ধের ঘোষণা দেন। তিনি টাকা ছাপিয়ে সহায়তা না দেওয়ার অবস্থানও নেন। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিতে বাধ্য হয়।

কোন ব্যাংক কত পেল

সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক—১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংক ৫ হাজার ৪২০ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে।

অন্যদিকে এবি ব্যাংক পেয়েছে ৪ হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ৩ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৬২৪ কোটি, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ২৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংক ২৫২ কোটি এবং বেসিক ব্যাংক ১৯৫ কোটি টাকা।

যেভাবে দেওয়া হয়েছে এই অর্থ

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬ (৪) (ডি) এবং ১৭ (১) (বি) ধারা অনুযায়ী, ৯০ দিন মেয়াদে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং পরিভাষায় এটি ‘ওভারনাইট-ওডি’ সুবিধা হিসেবে পরিচিত। এ ঋণের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সমমূল্যের ডিমান্ড প্রমিসরি নোট জমা দিয়েছে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে