ঢাকা, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
Sharenews24

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা

২০২৬ মার্চ ০২ ২১:০১:৫৫
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় নজিরবিহীন শিথিলতার সুযোগ নিয়ে ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। অথচ মাত্র তিন মাস আগে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাপক হারে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়ায় কাগজে-কলমে এই খেলাপি ঋণ কমেছে।

প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও ডিসেম্বর নাগাদ তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে খেলাপি ঋণ কমলেও ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। বর্তমানে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে ২ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি থাকলেও ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল প্রভিশন ঘাটতি সাধারণ আমানতকারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার পর অনেক গ্রাহক তাদের শ্রেণিকৃত ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধার আওতায় এনেছেন, যার ফলে একটি বড় অংকের ঋণ খেলাপি তালিকা থেকে বেরিয়ে গেছে।

ব্যাংক খাতের এই উত্থান-পতনের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের গোপন করা খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু পুনঃমূল্যায়নের পর দেখা যায় আগের বছরগুলোতে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল অংকের কুঋণ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপর ২০২৫ সালের শুরু থেকে প্রতি প্রান্তিকেই এই অঙ্ক বাড়তে থাকে—মার্চে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি থেকে জুনে ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে তা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটিতে গিয়ে ঠেকেছিল। বিদেশি অডিট ফার্মের নিরীক্ষা এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রকৃত তথ্য প্রকাশের ফলে খেলাপি ঋণের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়।

মিজান/

এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ কমানোর পেছনে কাজ করেছে গত সেপ্টেম্বরে ঘোষিত একটি বিশেষ নীতিমালা। এই সুবিধার আওতায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে দুই বছর পর্যন্ত কোনো কিস্তি দিতে হবে না (গ্রেস পিরিয়ড)। পরবর্তীতে এই শর্ত আরও শিথিল করে মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রায় ১,৫০০টি কোম্পানি ও গ্রুপ এই সুবিধার জন্য আবেদন করেছে এবং ইতোমধ্যে ১,৩০০টি প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ নিয়মিত করেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, এই নীতিগত সহায়তার ফলে অনেক ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

খাতওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ সেপ্টেম্বর শেষের ১.৫৮ লাখ কোটি থেকে কমে ডিসেম্বরে ১.৪৬ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই চিত্র আরও ইতিবাচক; সেখানে ৭৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা কমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩.৮৯ লাখ কোটি টাকা। তবে এই স্বস্তিকে সাময়িক বলে মনে করছেন অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পুনঃতফসিল করা এসব ঋণ থেকে আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে ২০২৭ সাল নাগাদ এই ঋণগুলো পুনরায় খেলাপি হয়ে পড়ার এবং ব্যাংক খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে