ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

মাত্র ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি 

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২৭ ১৫:৪৫:০২
মাত্র ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি 

নিজস্ব প্রতিবেদক: জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস বলেছিলেন, ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দপ্তরে যা ঘটল, তা যেন ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি এবং ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা গেল।

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার নেপথ্য কারিগর আহসান এইচ মনসুরকে হঠাৎ গভর্নরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে হাঁটু গেড়ে থাকা অর্থনীতিকে সামাল দেওয়া তার নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছিল।

দুপুর ২টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ত্যাগ করার সময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, “আমি পদত্যাগ করিনি, আমাকে অপসারণও করা হয়নি। মিডিয়ায় দেখলাম, তাই বাসায় চলে যাচ্ছি।” এসময় তাকে একদল বিক্ষুব্ধ মানুষের ভিড় এড়িয়ে বের হতে দেখা যায়।

প্রায় এক ঘণ্টা পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তার চার বছরের মেয়াদের অবশিষ্ট অংশ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের একটি মাঝারি মানের সোয়েটার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাকুর রহমান। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করেছে।

শিক্ষাগতভাবে তিনি একজন হিসাববিদ; অর্থনীতিবিদ বা ব্যাংকার নন। এছাড়া ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের জন্য মৌলিক পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে হলে দীর্ঘ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এবং অন্তত তিন বছর অতিরিক্ত বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। নতুন গভর্নরের এই যোগ্যতা নেই।

তিনি ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ এবং বিএনপির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ নিয়োগ আবারও আওয়ামী লীগ আমলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রাজনৈতিক নিয়োগের স্মৃতি রোমহর্ষকভাবে ফিরিয়ে দেয়।

এর আগে শেষ দুই গভর্নর ছিলেন অর্থসচিব, তার আগে একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হলেন। বিশ্বজুড়েও এমন নজির বিরল।

গভর্নরের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আহসান এইচ মনসুর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল রেখেছেন। ২০.৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ থেকে শুরু করে মাত্র ১৮ মাসে তা ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। টাকার বিপরীতে ডলারের দর প্রায় ১২২ টাকায় স্থিতিশীল।

অর্থপাচারের অন্যতম কৌশল ‘মিস-ইনভয়েসিং’ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন। মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮ শতাংশে এবং খেলাপি ঋণের বোঝা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখনো নাজুক। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-ঝুঁকি বেড়ে গেলে এলএনজির দাম বৃদ্ধি পেতে পারে, ফলে রিজার্ভ কমে যাবে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু এখন দায়িত্ব দেওয়া হলো অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা এক ব্যক্তির হাতে। এতে আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক ঋণ প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সংক্ষেপে, দেশের অর্থনীতি আবারও বিপদের মুখে এবং যদি তা ঘটে, তবে বাংলাদেশে এটি হবে নিঃসন্দেহে এক নতুন অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডি।

এমএম/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে