×
ঢাকা, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের ১২০ কোটি টাকার এফডিআর নিয়ে শঙ্কা!

২০২৬ অক্টোবর ৩১ ১৫:২১:৩৭
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের ১২০ কোটি টাকার এফডিআর নিয়ে শঙ্কা!

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সাধারণ বিমা খাতের প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের প্রায় ১২০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কোম্পানিটির ২০২৫ অর্থবছর-এর আর্থিক প্রতিবেদনের নিরীক্ষায় ৪৬টি ব্যাংকে রাখা এসব এফডিআরের অস্তিত্ব ও প্রকৃত মূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে ব্যর্থ হয়েছেন নিরীক্ষকরা। এর মধ্যে দেশের আর্থিকভাবে দুর্বল ৫টি ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকার আমানত আটকে রয়েছে। এসব অর্থ উদ্ধারের দৃশ্যমান কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও সম্ভাব্য লোকসান বা প্রভিশন বাবদ কোনো অর্থ আলাদা করে সঞ্চিতি (ইমপেয়ারমেন্ট প্রভিশন) রাখেনি কোম্পানিটি।

ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের সদ্য প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো বেরিয়ে এসেছে। নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বিভিন্ন ব্যাংকে ছড়ানো প্রায় ১২০ কোটি টাকার এই এফডিআর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, যা কোম্পানিটির নগদ ও সমতুল্য সম্পদের প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং মোট সম্পদের ঠিক অর্ধেক। ফলে আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদর্শিত এসব আমানতের সত্যতা, মূল্য এবং আদায়যোগ্যতা নিয়ে খোদ নিরীক্ষক পর্যায়েই বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে, দুর্বল ৫ ব্যাংকে থাকা ২৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকার বিনিয়োগ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষকরা। তাঁদের মতে, এসব ব্যাংকে রাখা অর্থের ভবিষ্যৎ খুবই অনিশ্চিত। তা সত্ত্বেও কোম্পানিটি এর বিপরীতে কোনো ধরনের ইমপেয়ারমেন্ট প্রভিশন সংরক্ষণ করেনি, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মূল্য বাস্তবের তুলনায় বেশ বাড়িয়ে দেখানোর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে ওই ব্যাংকগুলো থেকে দেখানো প্রায় ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার সুদ আয়ও। কারণ, এই লভ্যাংশ বা সুদ আদৌ আদায় করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

শুধু আমানত নয়, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ হিসাবের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের গরমিল খুঁজে পেয়েছেন নিরীক্ষকরা। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে হওয়া প্রায় ৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকার অবায়িত বা অনাদায়ী লোকসান কোম্পানিটি যথাযথভাবে হিসাবের খাতায় তোলেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কোম্পানির অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ রেকর্ডেও উল্লেখযোগ্য অসংগতি রয়েছে, যা বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য এবং আর্থিক প্রতিবেদনে তার সঠিক প্রতিফলন নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।

পর্যাপ্ত নথিপত্র ও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বীমা দাবি বাবদ দায়, প্রিমিয়াম আয়, গ্র্যাচুইটি ফান্ড এবং বেশ কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের হিসাবও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক দল। এমনকি পুরো আর্থিক প্রতিবেদনটি তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হিসাবমান এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধিবিধান অনুসরণেও নানা ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

কোম্পানিটির মোট সম্পদের সিংহভাগই ব্যাংক আমানত ও বিভিন্ন বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের অর্থের অস্তিত্ব ও মূল্য যখন স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় না এবং দুর্বল ব্যাংকের বিপরীতে কোনো প্রভিশন রাখা হয় না, তখন পুরো আর্থিক খসড়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচ ব্যাংকের ২৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা আটকে থাকা এবং তা উদ্ধারে অনিশ্চয়তার বিষয়টি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মূল ভিত্তি যদি এমন যাচাইহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তবে তাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভিত নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার পূর্ণ ঝুঁকি থাকে।

এদিকে ১২০ কোটি টাকার এফডিআর নিয়ে নিরীক্ষকদের এই শঙ্কার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিমা প্রতিষ্ঠানটির পদস্থ এক কর্মকর্তা জানান, অডিট প্রক্রিয়ার নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে তথ্য যাচাইয়ের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছু ব্যাংক নির্দিষ্ট সময়ে জবাব দিতে না পারায় নিরীক্ষকরা প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেন। পরবর্তীতে দেরিতে হলেও ব্যাংকের সেই তথ্যগুলো তাঁরা নিরীক্ষকদের সরবরাহ করেছিলেন।

অন্যদিকে, বিলম্বের বিষয়টি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ না করে সরাসরি আমানতের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা অসম্ভব—এমন মন্তব্যের বিষয়ে সংস্থাটির ওই কর্মকর্তা জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় নিরীক্ষকরা অতিরিক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারেননি।

এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি ব্যাংকে সংরক্ষিত আমানতের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, সংকটটি এখন আর কেবল কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং তা জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। এখানে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু করণীয় বা হাত ছিল না; কারণ দেশের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষই আজ এই ব্যাংক খাতের সার্বিক পরিস্থিতির ভুক্তভোগী।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে