×
ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশিদের নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যা বলা হলো

২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১০:১৪:১৯
বাংলাদেশিদের নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যা বলা হলো

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশে ভালো বেতনের চাকরি, আর্থিক সচ্ছলতা ও পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন অনেক বাংলাদেশি। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে প্রতারণার শিকার হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন আরও ২৮ দেশের নাগরিক। জাতিসংঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের রাশিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের অনেককে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কারও কারও পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া এবং রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গত সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে কমিশন প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন ও উজবেকিস্তানসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের প্রতারণামূলক বা জবরদস্তিমূলকভাবে নিয়োগের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীরা সবাই ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় নিয়োগকারী এজেন্টদের সহায়তায় মানব পাচারের সঙ্গে রুশ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জোরালো প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিশন।

এ ছাড়া ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করেছে তদন্ত কমিশন। এসব ভিসায় রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণের কথা উল্লেখ ছিল। নথিপত্রে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেসামরিক হিসেবে দেখানো হলেও এর আড়ালে রুশ সামরিক বাহিনীতে লোক নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন নিয়োগকারী এজেন্সির মাধ্যমে নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, ইলেকট্রিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো পেশায় চাকরির প্রলোভন দেখানো হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেকের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়। ভাষা বুঝতে না পারা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে অনেকে চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাননি বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এক বাংলাদেশির স্ত্রীর বক্তব্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর স্বামীর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে রুশ ভাষায় লেখা চুক্তির বিভিন্ন জায়গায় স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। প্রচণ্ড চাপের মুখে তাঁর স্বামীর সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী রিমেল মিয়ার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। ভালো চাকরির আশায় তিনি ২০২৫ সালের মার্চে রাশিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে নির্মাণকাজের চাকরি পাওয়ার আশায় ধারদেনা করে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু রাশিয়ায় গিয়ে প্রত্যাশিত স্থায়ী কর্মসংস্থান না পাওয়া এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতার মুখে পড়েন রিমেল। পরে তিনি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে আটক হন তিনি। সে সময় তিনি যুদ্ধের সম্মুখসারিতে মোতায়েন ছিলেন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে তিনি যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক রয়েছেন।

রিমেল মিয়ার ঘটনা বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া বাংলাদেশিদের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। চাকরির প্রলোভনে বিদেশে নিয়ে গিয়ে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত প্রতারণা নয়, বরং মানব পাচার ও জবরদস্তিমূলক নিয়োগের গুরুতর প্রশ্নও তৈরি করে।

বিদেশে চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, ভিসার ধরন, কাজের প্রকৃতি এবং চুক্তির শর্ত যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও নিয়োগপত্রের তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

রাশিয়ায় চাকরির নামে বাংলাদেশিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ভুক্তভোগীদের সংখ্যা এবং তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী পদক্ষেপও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে