×
ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

কারখানার শ্রমিক থেকে চারবারের প্রেসিডেন্ট লুলার জীবনকাহিনি

২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৮:১৪:০৫
কারখানার শ্রমিক থেকে চারবারের প্রেসিডেন্ট লুলার জীবনকাহিনি

নিজস্ব প্রতিবেদক: দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা, শৈশবে রাস্তায় বাদাম বিক্রি, কৈশোরে কারখানায় কাজ—জীবনের শুরুটা ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। সেই অবস্থান থেকে শ্রমিক আন্দোলনের নেতা, রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিত ‘লুলা’ নামে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি দুর্নীতির মামলায় কারাবাস, আদালতের রায়ে দণ্ড বাতিল এবং নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রত্যাবর্তনের মতো ঘটনাও রয়েছে তাঁর জীবনে। এবার ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে চতুর্থবারের মতো দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পথে এগিয়েছেন তিনি।

১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্নামবুকো রাজ্যের গারানিউন্স শহরে জন্ম লুলার। তাঁর পুরো নাম লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া লুলা ছোটবেলাতেই পরিবারের সঙ্গে উন্নত জীবিকার সন্ধানে সাও পাওলো অঞ্চলে চলে যান।

শৈশবে পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় রাস্তায় বাদাম, কমলা ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করতেন তিনি। অল্প বয়স থেকেই তাঁকে পরিবারের আয়ে অবদান রাখতে হয়েছিল। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও সীমিত ছিল। পরে জীবিকার তাগিদে কারখানায় কাজ শুরু করেন এবং ধাতবশিল্পে দক্ষতা অর্জন করেন।

কৈশোরে ধাতব কারখানায় কাজ করার সময় একটি দুর্ঘটনায় তাঁর বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলের অংশ হারান। এই অভিজ্ঞতাসহ শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক চিন্তা ও শ্রমিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

লুলার রাজনৈতিক উত্থানের মূল ভিত্তি শ্রমিক আন্দোলন। ১৯৭৫ সালে তিনি সাও বার্নার্দো দো কাম্পো ও দিয়াদেমার ধাতবশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। সে সময় ব্রাজিল সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও অধিকার নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি অর্জন করেন।

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে শ্রমিকদের ধর্মঘট ও সংগঠিত আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে ব্রাজিলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবির পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

১৯৮০ সালে শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি ব্রাজিলের রাজনীতিতে বামপন্থী ও শ্রমিকস্বার্থভিত্তিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার লক্ষ্যে লুলাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৮৯, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ২০০২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সরকার দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে।

তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচির মধ্যে ছিল ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’। এ কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী নিম্ন আয়ের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত শর্তের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে সহায়তা করার পাশাপাশি দারিদ্র্য মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়।

লুলার প্রথম দুই মেয়াদে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি, পণ্য রপ্তানি এবং সামাজিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়। তবে তাঁর সরকারের নীতি, সরকারি ব্যয়, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে বিতর্কও ছিল।

২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ২০১০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেন।

লুলার রাজনৈতিক জীবনে বড় ধাক্কা আসে ‘অপারেশন কার ওয়াশ’ নামে পরিচিত দুর্নীতিবিরোধী তদন্তের সময়। এই তদন্তে ব্রাজিলের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাসকে কেন্দ্র করে ঘুষ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় সামনে আসে। এ তদন্তের অংশ হিসেবে লুলার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা হয় এবং তাঁকে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

২০১৮ সালে তিনি কারাগারে যান এবং ২০১৯ সালের নভেম্বরে মুক্তি পাওয়ার আগে ৫৮০ দিন কারাবন্দি ছিলেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ড ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে। আদালতের সিদ্ধান্তের মূল কারণ ছিল, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে কুরিতিবার ১৩তম ফেডারেল আদালতের আইনগত এখতিয়ার ছিল না। পরে সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট মামলায় সাবেক বিচারক সার্জিও মোরোর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

দণ্ড বাতিল হওয়ার ফলে লুলার রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল হয় এবং তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তবে দণ্ড বাতিলের বিষয়টি মামলার অভিযোগের সব দিক নিয়ে নির্দোষতার সরাসরি বিচারিক ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়; আদালতের এখতিয়ার ও বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা ছিল সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেন। নির্বাচনের ফল ব্রাজিলের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।

তাঁর তৃতীয় মেয়াদে সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ, সরকারি নীতি ও রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে।

২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় লুলা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেন। ব্রাজিলের সুপিরিয়র ইলেক্টোরাল কোর্টের চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট।

প্রথম দফার নির্বাচনে লুলা পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় দফায় তিনি জয় নিশ্চিত করেন। এই ফলের মধ্য দিয়ে তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নতুন মেয়াদ শুরু হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি।

লুলার এই প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে তাঁর সামনে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা বজায় রাখার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

লুলার জীবনকাহিনি ব্রাজিলের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দরিদ্র পরিবারে জন্ম, অল্প বয়সে শ্রমজীবনে প্রবেশ, ইউনিয়ন নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা, প্রেসিডেন্ট হওয়া, কারাবাস এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল।

তাঁর সমর্থকেরা সামাজিক সুরক্ষা ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নেওয়া উদ্যোগকে গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর সরকারের নীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং দুর্নীতিসংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই দুই দিক বিবেচনায় নিয়েই লুলার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শৈশবে রাস্তায় বাদাম বিক্রি করা এক শ্রমজীবী মানুষের ব্রাজিলের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে পৌঁছানোর গল্প শুধু ব্যক্তিগত উত্থানের কাহিনি নয়; এটি দেশটির শ্রমিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক পরিবর্তন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতারও প্রতিচ্ছবি।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে