×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সামনে এলো নজরুলের পুরোনো ফেসবুক পোস্ট

২০২৬ অক্টোবর ২০ ১১:৫০:০৬
সামনে এলো নজরুলের পুরোনো ফেসবুক পোস্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঋণের বোঝা কমিয়ে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলাম মাহিন। কিন্তু পরিবারের সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই থেমে গেছে তার জীবন। সৌদি আরবের মক্কায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার পুরোনো ফেসবুক পোস্টগুলো। মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, প্রবাসজীবনের স্বপ্ন এবং স্বজনদের জন্য তার আকুতির কথাগুলো স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন অনেকে।

২০২৩ সালের ৩ মে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নজরুল লিখেছিলেন, ‘চিন্তা কমাতেও চিন্তা করতে হয় মধ্যবিত্ত সন্তানদের।’ পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় সাত লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রবাসে গিয়ে পরিবারের দুশ্চিন্তা দূর করার পরিবর্তে তার জীবনই আটকে যায় কারাগারে।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানাজানি হওয়ার পর তার পুরোনো ফেসবুক পোস্টগুলো ঘিরে শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছেন পরিচিতজন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা।

নজরুলের ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা যায়, প্রবাসজীবনের শুরু থেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারের সংকট, স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে বিভিন্ন কথা লিখতেন তিনি। ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর দেশ ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে তোলা একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছিলেন, ‘গুড বাই বাংলাদেশ। সবাই অনেক মনে পড়ছে, সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’

সৌদি আরবে যাওয়ার পর একই বছরের ২৯ নভেম্বর আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ভাব নেয়াটা আমাকে মানায় নাহ, কারণ আমি মধ্যবিত্ত।’ ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘাসের ওপর শুয়ে থাকা একটি ছবি প্রকাশ করে লেখেন, ‘পকেটে টাকা থাকলে তোমরা দুনিয়া কিনতে পারবে।’ আর ওই বছরের ৩ মে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের দুশ্চিন্তা নিয়ে তার আক্ষেপের কথাটি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

প্রবাসে কাজ পাওয়ার পর মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন নজরুল। ২০২৩ সালের ৮ মার্চ কাবা শরিফের সামনে নীল রঙের ইউনিফর্ম পরা নিজের একটি ছবি পোস্ট করে তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ছবিটির ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ক্লিনার মক্কা হেরাম শরিফ।’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর ওই ছবিতেও শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছেন অনেকে।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। এরপর থেকে কারাগারে ছিলেন তিনি। পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকার সময় প্রতি রোববার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যম ও ফেসবুকে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে তারা ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শোনার পর ওই দিন রাতেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার ফুফু আবেদা বেগম বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেন, কারাগারে থাকার সময় ছেলে নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু হঠাৎ করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েছেন।

নজরুলের বাবা আব্দুল বাছিরের ভাষ্য, সংসারের হাল ধরার আশায় সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় নজরুলকে কারাগারে যেতে হয়। এর মধ্যে তিনি পরিবারকে মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন।

ছেলের মৃত্যুর পর একদিকে ঋণদাতাদের চাপ, অন্যদিকে সন্তান হারানোর শোক—দুই সংকটে পড়েছে পরিবারটি। নজরুল কী কারণে কারাগারে ছিলেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানতেন না বলে দাবি করেছেন তার বাবা। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে সহায়তা চাইছেন তিনি।

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠকেরা। তাদের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স সোসাইটির (এইচআরডিএস) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. সুজন সরকার বলেন, প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে কোনো রেমিট্যান্সযোদ্ধার এমন পরিণতি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে হয়তো এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো বলেও মনে করেন তিনি।

সামাজিক সংগঠক শামীম আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের দুজন নাগরিক তিন বছরের বেশি সময় সৌদি আরবে কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। সৌদি আরবে নারী কর্মীদের যৌন হয়রানি ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে উল্লেখ করে এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে এলে নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা করা হবে।

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর তার পরিবার এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছে। ঋণের বোঝা ও স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে