×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

মুনাফায় উল্লম্ফন, সম্পদমূল্য বৃদ্ধি—প্রিমিয়ার সিমেন্টের ডিভিডেন্ডে নতুন সম্ভাবনা

২০২৬ অক্টোবর ২০ ০১:৫০:৪৬
মুনাফায় উল্লম্ফন, সম্পদমূল্য বৃদ্ধি—প্রিমিয়ার সিমেন্টের ডিভিডেন্ডে নতুন সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট উৎপাদনকারী কোম্পানি প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসির আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমলেও তৃতীয় প্রান্তিকে এসে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ফলে প্রথম নয় মাসের সম্মিলিত হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও বেড়েছে। তবে আয় বাড়লেও পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় কম রয়েছে।

এদিকে কোম্পানিটির একীভূতকরণ, উচ্চ ব্যয়ের স্বল্পমেয়াদি দায় পুনর্গঠন এবং নতুন মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ আর্থিক পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কোম্পানিটির নগদ লভ্যাংশ বাড়বে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

কোম্পানিটির প্রকাশিত অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ৯৯ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৬৭ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ১ টাকা ৩২ পয়সা বা প্রায় ১৯৭ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধির পুরো চিত্র বুঝতে হলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফল আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আয় কমলেও পরবর্তী তিন মাসে বড় উল্লম্ফন হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রিমিয়ার সিমেন্টের শেয়ারপ্রতি আয় কমে দাঁড়ায় ১২ পয়সায়। আগের অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে এই আয় ছিল ১৪ পয়সা। অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ২ পয়সা বা প্রায় ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। যদিও আয় কমেছে, এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ বেড়েছে।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে এই প্রবাহ ছিল ৩ টাকা ৪৮ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ টাকা ৯৬ পয়সা। অর্থাৎ নগদ প্রবাহ বেড়েছে ৫২ পয়সা বা প্রায় ১৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ৬৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬৪ টাকা ৬৩ পয়সায় দাঁড়ায়।

প্রথম প্রান্তিকে আয় কমলেও পরিচালন নগদ প্রবাহ ও নিট সম্পদমূল্যে ইতিবাচক পরিবর্তন ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে আয় ও নগদ প্রবাহ—দুই ক্ষেত্রেই দুর্বলতা দেখা যায়। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয় মাত্র ৭ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ২৩ পয়সা। ফলে দ্বিতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ১৬ পয়সা বা প্রায় ৬৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

দ্বিতীয় প্রান্তিকের ফলাফল প্রথম ছয় মাসের সম্মিলিত হিসাবেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়ায় ১৯ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৬ পয়সা। অর্থাৎ ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ১৭ পয়সা বা প্রায় ৪৭ দশমিক ২২ শতাংশ। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, অর্থবছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটি আগের বছরের তুলনায় দুর্বল আয়ের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে।

শুধু আয় নয়, প্রথম ছয় মাসে নগদ প্রবাহ ও সম্পদমূল্যেও চাপ দেখা যায়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ৩ টাকা ৬৭ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৫ টাকা ৪৮ পয়সা। অর্থাৎ এই সূচকে কমেছে ১ টাকা ৮১ পয়সা বা প্রায় ৩৩ দশমিক ০৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য নেমে দাঁড়ায় ৬৩ টাকা ৭০ পয়সায়, যেখানে ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা ছিল ৬৪ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমেছিল ৮০ পয়সা।

প্রথম ছয় মাসের এই দুর্বল ফলাফলের পর তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির আর্থিক চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে প্রিমিয়ার সিমেন্টের সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ টাকা ৮০ পয়সায়। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৩১ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ১ টাকা ৪৯ পয়সা বা প্রায় ৪৮১ শতাংশ। প্রথম দুই প্রান্তিকে আয় কমার পর তৃতীয় প্রান্তিকে এমন প্রবৃদ্ধি কোম্পানিটির নয় মাসের সম্মিলিত ফলাফলকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে।

তৃতীয় প্রান্তিকের এই আয় বৃদ্ধির ফলে প্রথম ছয় মাসের দুর্বলতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠে কোম্পানিটি। আগের বছরের একই সময়ে প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৬৭ পয়সা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৯৯ পয়সায়। অর্থাৎ নয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় প্রায় তিন গুণ হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় প্রান্তিকে আয় কেন এতটা বেড়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশিত আর্থিক তথ্যের বাইরে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তাই কোম্পানির একীভূতকরণ বা মূলধন পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তকে সরাসরি এই আয় বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব এবং তৃতীয় প্রান্তিকের আয় বৃদ্ধির বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একীভূতকরণ ও মূলধন পুনর্গঠনের উদ্যোগ

প্রিমিয়ার সিমেন্টের আর্থিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে কোম্পানিটির একীভূতকরণ এবং মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানিটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ প্রিমিয়ার পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড এবং ন্যাশনাল সিমেন্ট মিলস লিমিটেডকে প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসির সঙ্গে একীভূত করার স্কিম অনুমোদন করেছে। একীভূতকরণের এই প্রস্তাব কোম্পানির বিশেষ সাধারণ সভায় অনুমোদিত হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৫ সালের ১২ ও ২৭ নভেম্বর বিষয়টি শুনানি করে এবং ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি চূড়ান্ত রায় ও আদেশ দেয়। কোম্পানিটি ওই আদেশের সত্যায়িত অনুলিপি পায় ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি। আদালতের নির্দেশনা ও আদেশের শর্ত অনুসরণ করে এই একীভূতকরণ কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

একীভূতকরণের ফলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্পদ, দায়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং আর্থিক হিসাবের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে এই প্রভাব কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে একীভূতকরণের বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা, দায়ের পরিমাণ এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতার ওপর। একীভূতকরণ অনুমোদিত হওয়া মানেই তাৎক্ষণিকভাবে মুনাফা বেড়ে যাওয়া নয়। এর আর্থিক সুফল মূল্যায়নের জন্য পরবর্তী প্রতিবেদন ও বিস্তারিত হিসাব প্রয়োজন।

এদিকে কোম্পানিটির মূলধন পুনর্গঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এসেছে অগ্রাধিকার শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদনে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রিমিয়ার সিমেন্টকে ৩২২টি সম্পূর্ণ পরিশোধযোগ্য, রূপান্তর-অযোগ্য, অংশগ্রহণবিহীন ও ক্রমপুঞ্জীভূত অগ্রাধিকার শেয়ার ইস্যুর সম্মতি দিয়েছে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ৫০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এই শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ১৬১ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান ব্যালান্স শিট পুনর্গঠন করা এবং উচ্চ ব্যয়ের স্বল্পমেয়াদি দায় পরিশোধ করা। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর শেয়ারহোল্ডারদের বিশেষ সাধারণ সভায়ও উদ্যোগটি অনুমোদিত হয়েছিল। মূলধন সংগ্রহের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উচ্চ ব্যয়ের স্বল্পমেয়াদি দায়ের চাপ কমানো এবং আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ সুদ বা অর্থায়ন ব্যয়ের দায় কমলে ভবিষ্যতে মুনাফার ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে ১৬১ কোটি টাকার অগ্রাধিকার শেয়ার ইস্যুর অনুমোদনকে সরাসরি তৃতীয় প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। কারণ, এই অনুমোদনের ঘোষিত উদ্দেশ্য মূলধন পুনর্গঠন ও উচ্চ ব্যয়ের স্বল্পমেয়াদি দায় পরিশোধ। অর্থায়ন ব্যয় কমানোর সুবিধা তখনই আর্থিক ফলাফলে প্রতিফলিত হতে পারে, যখন অর্থ সংগ্রহ ও দায় পরিশোধের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয় এবং তার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যয় প্রকৃতপক্ষে কমে আসে।

প্রকাশিত তথ্য থেকে বোঝা যায়, কোম্পানিটি আর্থিক কাঠামো উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছে; তবে তৃতীয় প্রান্তিকের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য আরও বিস্তারিত আর্থিক তথ্য প্রয়োজন।

কোম্পানিটির ঋণমানও আর্থিক মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস পিএলসি প্রিমিয়ার সিমেন্টকে দীর্ঘমেয়াদে ‘এএ’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’ ঋণমান দিয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনিরীক্ষিত আর্থিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরিমাণগত ও গুণগত তথ্য বিবেচনায় এই ঋণমান নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণমান কোম্পানিটির আর্থিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন দিলেও এটি ভবিষ্যৎ মুনাফা বা লভ্যাংশ বৃদ্ধির নিশ্চয়তা নয়।

নগদ প্রবাহ কমায় কি লভ্যাংশ বৃদ্ধিতে বাধা তৈরি হবে?

প্রিমিয়ার সিমেন্টের আয় বৃদ্ধির বিপরীতে নগদ প্রবাহের চিত্র পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ হয়েছে ৪ টাকা ৬২ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৬ টাকা ৮ পয়সা। অর্থাৎ আয় বাড়লেও পরিচালন নগদ প্রবাহ কমেছে ১ টাকা ৪৬ পয়সা বা প্রায় ২৪ দশমিক ০১ শতাংশ।

এখানে আয় ও নগদ প্রবাহের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। শেয়ারপ্রতি আয় হিসাব করা হয় নির্দিষ্ট সময়ের মুনাফার ভিত্তিতে। অন্যদিকে, পরিচালন নগদ প্রবাহ দেখায় ব্যবসার কার্যক্রম থেকে বাস্তবে কত নগদ অর্থ এসেছে বা ব্যয় হয়েছে। ফলে শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধি পেলেও নগদ প্রবাহ কমে গেলে কোম্পানির দৈনন্দিন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ এবং লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষেত্রে নগদ অর্থের প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ টাকা ৫০ পয়সায়। ২০২৫ সালের ৩০ জুন এই মূল্য ছিল ৬৪ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ১ টাকা বা প্রায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। প্রথম ছয় মাসে সম্পদমূল্য কমে গেলেও তৃতীয় প্রান্তিক শেষে তা আগের অর্থবছরের সমাপনী অবস্থানের চেয়ে বেশি হয়েছে।

নিট সম্পদমূল্য বৃদ্ধি এবং তৃতীয় প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধির বিষয়টি কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে নগদ প্রবাহ কম থাকায় শুধু এই দুটি সূচকের ভিত্তিতে লভ্যাংশ বাড়বে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। মূলধন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আর্থিক ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেই সুবিধা কতটা এবং কখন আর্থিক ফলাফলে প্রতিফলিত হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও পরবর্তী আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর।

এবার কি বাড়বে প্রিমিয়ার সিমেন্টের ডিভিডেন্ড?

প্রিমিয়ার সিমেন্ট ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড সুপারিশ করেছিল। এখন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিবেচনার জন্য আগামী ২৭ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছে কোম্পানিটি। সভায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা হবে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য নতুন লভ্যাংশের পরিমাণ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

ডিভিডেন্ড বাড়ার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় ৬৭ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৯৯ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ১ টাকা ৩২ পয়সা বা প্রায় ১৯৭ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে ১ টাকা ৮০ পয়সা শেয়ারপ্রতি আয় হওয়ায় নয় মাসের সম্মিলিত ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।

অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকেও যদি কোম্পানিটি মুনাফার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে এবং নিরীক্ষিত হিসাবে পর্যাপ্ত বিতরণযোগ্য মুনাফা থাকে, তাহলে আগের বছরের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের তুলনায় বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একীভূতকরণ ও মূলধন পুনর্গঠনের উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ ব্যয়ের স্বল্পমেয়াদি দায় পরিশোধের মাধ্যমে অর্থায়ন ব্যয় কমানো সম্ভব হলে ভবিষ্যৎ মুনাফা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই সম্ভাব্য সুবিধা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে অর্থ সংগ্রহ, দায় পরিশোধ এবং একীভূতকরণের বাস্তবায়নের ওপর। তাই এসব উদ্যোগকে লভ্যাংশ বৃদ্ধির সম্ভাব্য সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়, কিন্তু নিশ্চিত কারণ হিসেবে নয়।

অন্যদিকে, পরিচালন নগদ প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় কমে যাওয়ায় ডিভিডেন্ড বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে। কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি পেলেও নগদ অর্থের পর্যাপ্ততা, ঋণ পরিশোধের প্রয়োজন, মূলধন ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বিবেচনা করে পরিচালনা পর্ষদ ডিভিডেন্ড নির্ধারণ করবে। যদি নগদ অর্থের ওপর চাপ থাকে অথবা পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত হিসাবে প্রত্যাশিত মুনাফা না আসে, তাহলে আগের বছরের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তও আসতে পারে।

এ ছাড়া প্রথম দুই প্রান্তিকে আয় কমে যাওয়ার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তৃতীয় প্রান্তিকের বড় প্রবৃদ্ধি নয় মাসের সম্মিলিত ফলাফলকে ইতিবাচক করেছে, কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির উৎস এবং স্থায়িত্ব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। তৃতীয় প্রান্তিকের আয় বৃদ্ধির পেছনে নির্দিষ্ট কোন আয় বা ব্যয়ের খাত কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে স্পষ্ট নয়। ফলে শুধু একটি প্রান্তিকের বড় প্রবৃদ্ধিকে ভিত্তি করে পুরো বছরের আয় একই হারে বাড়বে বলে ধরে নেওয়া যুক্তিসংগত হবে না।

সব মিলিয়ে, প্রিমিয়ার সিমেন্টের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। প্রথম দুই প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় কমলেও তৃতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে ১ টাকা ৮০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ফলে নয় মাসের সম্মিলিত শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের ৬৭ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৯৯ পয়সা হয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও বেড়েছে। তবে পরিচালন নগদ প্রবাহ কমে যাওয়া এবং তৃতীয় প্রান্তিকের আয় বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় ডিভিডেন্ড বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ২৭ অক্টোবরের পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল ও লভ্যাংশের সুপারিশ। পূর্ণ বছরের মুনাফা, নগদ প্রবাহ, মূলধন পুনর্গঠন কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায় বিবেচনা করেই কোম্পানিটি ডিভিডেন্ড বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের চেয়ে বেশি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; তবে নগদ প্রবাহের দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে ডিভিডেন্ড অপরিবর্তিতও থাকতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য পরিচালনা পর্ষদের ঘোষণার অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে