×
ঢাকা, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

দিল্লিতে নজিরবিহীন ধরপাকড়, মমতাসহ আটক চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী

২০২৬ অক্টোবর ১০ ১৯:২০:৩৪
দিল্লিতে নজিরবিহীন ধরপাকড়, মমতাসহ আটক চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শনিবার দিল্লিতে ব্যাপক পুলিশি অভিযান চালানো হয়েছে। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা, ছাত্রনেতা, আইনজীবী ও বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে দিল্লিগামী সব মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন। খবর এনডিটিভির।

আটক ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন।

পুলিশের ভাষ্য, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আয়োজনের অনুমতি নেওয়া হয়নি। এ কারণে সেখানে জমায়েত ঠেকাতে ভোর থেকেই অভিযান শুরু করা হয়। মুম্বাই থেকে আসা একটি বিমানের ভেতর থেকে সিজেপির তিন শীর্ষ নেতাকে আটক করা হয়। পরে দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউতে বাসার সামনে ধর্নায় বসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সঙ্গে থাকা পাঁচ সাংসদকে আটক করে পুলিশ। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাসভবন ঘিরে রাখার পর তিনি বাইরে বের হলে তাঁকেও আটক করা হয়। পিনারাই বিজয়ন, জন ব্রিট্টাসসহ কয়েকজনকে ছত্রসাল স্টেডিয়ামের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।

বিমানের ভেতরে ঢুকে আটক সিজেপির তিন নেতা

শনিবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছানোর পরই সিজেপির তিন শীর্ষ নেতা পুলিশের হাতে আটক হন। মুম্বাই থেকে আসা বিমানে ছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা। সকাল ১০টা ১৯ মিনিটে বিমানটি দিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণের পর দক্ষিণ-পশ্চিম জেলার পুলিশ সদস্যরা বিমানের ভেতরে ঢুকে তাঁদের আটক করেন। এ সময় নারী পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। অন্য যাত্রীদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিমানের ভেতর থেকে ইনস্টাগ্রামে সরাসরি সম্প্রচারে আসেন সিজেপি নেতারা। ওই সম্প্রচারে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের বাগ্‌বিতণ্ডার দৃশ্য দেখা যায়। অভিজিৎ দীপকে বলেন, আটক হওয়ার আশঙ্কা জেনেই তিনি দিল্লিতে এসেছেন এবং এতে তিনি ভয় পাচ্ছেন না। পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তিন নেতাকে আটকের পর পৃথক তিনটি স্থানে নেওয়া হয়। দীপকেকে গুরুগ্রামে, সৌরভকে দিল্লিতে এবং রাঙ্কাকে দ্বারকায় রাখা হয়েছে।

আটকের পর দেওয়া বিবৃতিতে সিজেপি অভিযোগ করে, বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই দলের নেতৃত্বকে আটক করা ছিল পূর্বপরিকল্পিত পদক্ষেপ। দলটির মতে, এ ঘটনা নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতার পরিপন্থী। আটক তিন নেতাকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

আটক হওয়ার সময় দীপকে বলেন, ভারতে জরুরি অবস্থা চলাকালে ইন্দিরা গান্ধীও এমন আচরণ করেননি। এর আগে ধারণ করা একটি ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, তাঁরা আটক হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন অজিঙ্ক শিন্দে।

বাসার সামনে ধর্না, মমতাসহ ছয়জন আটক

শনিবার দুপুরে দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ এলাকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাসা থেকে বের হতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি কয়েকজন সাংসদকে সঙ্গে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে বসে প্রতিবাদ শুরু করেন। এ সময় তাঁর মুখে ব্যান্ডেজ দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সাংসদ দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, ডেরেক ও’ব্রায়েন, শামিরুল ইসলাম ও সাকেত গোখলেকে একটি পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।

তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কুণাল ঘোষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে অভিযোগ করেন, মমতাকে দিল্লিতে তাঁর বাসা থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না এবং প্রতিবাদ করার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না।

আটক অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকার

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি বিরোধী দলের আরও তিন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাসভবন সকাল থেকেই ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। সেখান থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাঁকে আটক করা হয়।

আটকের পর দেওয়া ভিডিও বার্তায় কেজরিওয়াল বলেন, ভারতের তরুণেরা ভয় পাবে না। ভোট চুরির বিরুদ্ধে তাঁদের আন্দোলন চলবে।

কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, সিপিএমের সাংসদ জন ব্রিট্টাস এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকেও আটক করে ছত্রসাল স্টেডিয়ামের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। সেখানে এর আগে পিনারাই বিজয়ন ও বৃন্দা কারাতসহ অন্যদের রাখা হয়েছিল।

নেহা বোরা, তুষার গান্ধী ও আইনজীবীরাও আটক

শনিবার সকালে দিল্লির উদ্দেশে যাওয়ার পথে আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করা হয়। সিজেপির কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাওয়ার সময় বেশ কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। সিজেপির আইনি সহায়তাকারী আইনজীবী রত্না সিংহও আটক হয়েছেন।

অন্যদিকে, মুম্বাইয়ে নিজের বাসা থেকে আটক করা হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকে। সিজেপির প্রতি সমর্থন জানিয়ে অগস্ট ক্রান্তি ময়দানে আয়োজিত কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে ডিএন নগর থানায় নেওয়া হয়েছে।

ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকেও গুরুগ্রামের বাসা থেকে আটক করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।

যন্তর মন্তরে সাত স্তরের ব্যারিকেড, কড়া নিরাপত্তা

সিজেপির বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে পুরো দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। যন্তর মন্তরে সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ায় সেখানে জমায়েত ঠেকাতে পুলিশ তৎপর ছিল। সকালে যন্তর মন্তরের ফাঁকা এলাকার ভিডিও প্রকাশ করে দিল্লি পুলিশ লিখেছে, যারা শহরে শান্তি চান, তাঁদের জন্য এই ব্যবস্থা। একই সঙ্গে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়, ওই এলাকায় জমায়েত হলে আটক করা হবে।

যন্তর মন্তরে যাওয়ার সড়কগুলোতে সাত স্তরের ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়। কাছাকাছি কয়েকটি ব্যারিকেড ঝালাই করে শক্ত প্রাচীরের মতো করা হয়। সড়কে বসানো হয় স্টিলের কাঁটাও। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ধারণ করতে ভিডিওগ্রাফার মোতায়েন করা হয়; অনেক পুলিশ সদস্যের শরীরে ছিল বডিক্যাম। আকাশে ড্রোন উড়তে দেখা যায়। আন্দোলনকারীরা যাতে আশ্রয় নিতে না পারেন, সে জন্য হোটেল ও এয়ারবিএনবিতেও তল্লাশি চালানো হয়। কনট প্লেস এলাকা থেকে পাঁচটি বাসে করে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। বন্ধ স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজীব চক, পটেল চক ও কাশ্মীরি গেট। প্রথমে ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছিল। তবে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ না করার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্যের পর বন্ধ স্টেশনের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়।

এ ছাড়া শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে আসা সব মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ, এবার সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের বিক্ষোভে অংশ নিতে শুক্রবারই দিল্লিতে পৌঁছান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই দিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ইন্ডিয়া জোটের প্রতিনিধিদলেও তিনি ছিলেন। বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করা এবং গত দুই বছরে অনুষ্ঠিত সব বিধানসভা নির্বাচন বাতিলের দাবি জানানো হয়।

বৈঠক শেষে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ভোট চুরির অভিযোগ অস্বীকার না করায় তিনি রাষ্ট্রপতির অবস্থানে বিস্মিত হয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রপতি অভিযোগ মেনে নিয়েছেন—রাহুলের এমন দাবি সঠিক নয়।

রাহুল গান্ধী আরও জানিয়েছেন, বিরোধী নেতারা সোমবার সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেবেন। ওই দিন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বড় ধরনের বিক্ষোভেরও ডাক দিয়েছে ইন্ডিয়া জোট।

মিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে