×
ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুললেন আসিফ মাহমুদ

২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১০:২৯:৫৩
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুললেন আসিফ মাহমুদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, তাঁরা ভারতবিরোধী নন; বরং আধিপত্যবাদের বিরোধী। বাংলাদেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্য কোনো দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার বিরোধিতা করেন তাঁরা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুবিধাকে সবার আগে বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘আবরার ফাহাদ: দিল্লির আধিপত্যবাদ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ।

‘বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নেই আমাদের অবস্থান’

আলোচনা সভায় আসিফ মাহমুদ বলেন, ফ্যাসিবাদের আমলে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ভারতকে যা দেওয়া হয়েছে, তা ভারত আজীবন মনে রাখবে। তাঁর অভিযোগ, সে সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতির ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থের পরিবর্তে ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তাঁদের ভারতবিরোধী বলা হলেও তাঁদের প্রকৃত অবস্থান আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে।

তিনি আরও বলেন, ভারতের বিষয়ে বর্তমান সরকারের নীতিগত অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। ভবিষ্যতের আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনীতির দর্শন বুঝতে শহীদ আবরার ফাহাদের আটটি স্তম্ভের ধারণাগুলো অনুধাবন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তরুণদের প্রশিক্ষণ প্রকল্প নিয়ে বাধার অভিযোগ

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়ার কথা উল্লেখ করেন এনসিপির এই মুখপাত্র। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আট হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি জানান, পরিকল্পনায় কাঠের অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাইকোয়ান্দো, কারাতে ও অন্যান্য আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এ উদ্যোগ ঘিরে বিভিন্ন ধরনের বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আসিফ মাহমুদের দাবি, তিন বছরে আট হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাকে ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ‘রক্ষীবাহিনী’ গঠনের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁর মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের তুলনায় এটি ছিল সীমিত পরিসরের একটি উদ্যোগ।

রাজনৈতিক সুবিধার জন্য নৈতিক অবস্থান বদলের অভিযোগ

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, কিছু রাজনীতিক প্রকাশ্যে বিভিন্ন অবস্থান তুলে ধরলেও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন। তাঁর ভাষ্য, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থান নিলে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন, দলের ভেতরে প্রভাব কিংবা মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন হিসাব থেকে কেউ কেউ নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেন।

এ প্রসঙ্গে সিকিমের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নীতিগত আপস এবং আধিপত্যবাদী প্রভাব একটি রাষ্ট্রের স্বাধীন অস্তিত্বের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের নৈতিক পরাজয়ের পরিণতি পুরো রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চট্টগ্রাম বন্দরের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে আসিফ মাহমুদ বলেন, এ ধরনের চুক্তিতে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে এবং অপর পক্ষ কী সুবিধা পাচ্ছে, তা বিবেচনা করা জরুরি।

তাঁর মতে, চুক্তিটি দেশের জনগণের জন্য কতটা লাভজনক এবং এতে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা। দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি উভয়ের জন্যই লাভজনক হতে পারে।

ভারতের সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকলে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করতেও তাঁদের আপত্তি নেই। তবে কোনো চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি সামান্য অথচ অপর পক্ষের সুবিধা অনেক বেশি হলে তাঁরা সেই চুক্তির বিরোধিতা করবেন।

পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানিবণ্টনেও গুরুত্ব

পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকটের কথা উল্লেখ করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও লাভজনক সমঝোতা হলে তা বাংলাদেশের জনগণের জন্য ইতিবাচক হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্য কোনো দেশকে সুবিধাজনক অবস্থানে নেওয়ার পক্ষে তাঁরা নন।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতায় বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বাস্তব কাজেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে