×
ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

২২ ব্যাংকের লোকসান আড়াই লাখ কোটি টাকা, বাড়ছে সংকট

২০২৬ অক্টোবর ০৫ ২০:৩৯:০৩
২২ ব্যাংকের লোকসান আড়াই লাখ কোটি টাকা, বাড়ছে সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি এখন পুঞ্জীভূত লোকসান নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের সম্মিলিত পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা থাকলেও নিট হিসাবে বড় অঙ্কের লোকসান হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া এক প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল রোববার কমিটির কাছে উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে মার্চ ২০২৬ ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি ও সংকটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। তবে বিভিন্ন ব্যয়, প্রভিশন ও সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতি সমন্বয়ের পর ব্যাংকগুলোর নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। এগুলো হলো জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক। দেশে মোট রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ছয়টি। এ ছাড়া বিশেষায়িত দুই ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) এবং বিদেশি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানও লোকসানের তালিকায় রয়েছে।

অন্যদিকে লোকসানে থাকা বাকি ১৫টি ব্যাংকই বেসরকারি খাতের। এগুলো হলো এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, মেঘনা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, উচ্চ শ্রেণিকৃত বা মূলত খেলাপি ঋণ, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রভিশন সংরক্ষণে ঘাটতি, মূলধনের দুর্বলতা এবং সম্পদের মান খারাপ হওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোর আয় করার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা হলেও বিভিন্ন সমন্বয়ের পর অনেক ব্যাংক শেষ পর্যন্ত নিট লোকসানে চলে যাচ্ছে।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংক খাতে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো অল্প সময়ে দূর করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বর্তমান লোকসানের পেছনে ওই পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে। তবে ব্যাংকটি লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে লোকসানে থাকা বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের মধ্যে ১২টির বিষয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবি ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ও সীমান্ত ব্যাংক ছাড়া বাকি ৯টি ব্যাংক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের নেতা ও তাঁদের অনুগত ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে এসব ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম এবং ঋণের নামে অর্থ বের করে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে অনিয়মের প্রভাব খেলাপি ঋণের পরিমাণেও পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, দেশের ২২টি ব্যাংক লোকসানে থাকা অর্থনীতির জন্য কতটা স্বাস্থ্যকর। তিনি বলেন, এটি মোটেও স্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি নয়। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য বোঝার অন্যতম সূচক হলো খেলাপি ঋণের হার। সেখানে যখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ খেলাপি হয়ে যায় এবং একই সঙ্গে এক-তৃতীয়াংশের বেশি ব্যাংক লোকসানে থাকে, তখন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বলতার কারণে সামগ্রিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থার সংকটও তৈরি হতে পারে।

১২ ব্যাংককে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা

ব্যাংক খাতের আর্থিক দুর্বলতার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় তারল্য সহায়তার পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, গত মার্চ পর্যন্ত ১৫টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণের শর্ত পূরণ করতে পারেনি। অন্যদিকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নিয়েছে।

কোনো ব্যাংক নগদ অর্থের সংকটে পড়লে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সহায়তা চাইতে পারে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪৩ কোটি, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি এবং ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংক পেয়েছে ৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ৪ কোটি, এবি ব্যাংক ৪ হাজার ২৭০ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৬১৫ কোটি এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক পেয়েছে ২৫২ কোটি টাকা।

পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ১৭ হাজার কোটি টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এসব সহায়তা কত বছরের মধ্যে দেওয়া হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

ব্যাংক সংস্কারে সংসদীয় কমিটিতে প্রস্তাব

ব্যাংক খাতের সংকট ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও বিভিন্ন প্রস্তাব উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির সদস্য ও এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ খেলাপি ঋণ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে একটি সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম তাঁদের দলের পক্ষ থেকে ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে একটি লিখিত প্রস্তাব দেন।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহি করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিষয় লুকানো হবে না। তিনি আরও বলেন, অনেকেই ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান হতে চান, তবে অর্থনীতিতে রাজনীতিকরণের কোনো সুযোগ নেই।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য সাইফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা কমানো প্রয়োজন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মতো ছোট একটি দেশে বর্তমান সংখ্যক ব্যাংকের প্রয়োজন নেই।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সদস্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, সফিকুর রহমান ও সৈয়দ জয়নুল আবেদীন।

সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের বিপুল চাপ, ২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান, মূলধন ঘাটতি এবং সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তার তথ্য দেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক দুর্বলতার চিত্র সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সংখ্যা, সুশাসন ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও সংসদীয় কমিটির আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে