×
ঢাকা, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ, ৯০% খেলাপি-এবার বন্ধের পথে ব্যাংক

২০২৬ অক্টোবর ০৪ ০৯:৪৫:৩৩
৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ, ৯০% খেলাপি-এবার বন্ধের পথে ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ, পুঞ্জীভূত লোকসান ও মূলধন ঘাটতির কারণে পদ্মা ব্যাংক পিএলসিকে অবসায়নের পথে নেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটি সচল রাখতে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় এবার ব্যাংকটি গুটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পদ্মা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি, তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার মতো কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের জন্য চলতি মাসেই অবসায়নের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হতে পারে। প্রস্তাব অনুমোদন হলে ব্যাংকিং রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ্মা ব্যাংক বন্ধ করার কার্যক্রম শুরু হবে। এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি নজিরবিহীন ঘটনা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক সংকট এতটাই গভীর যে অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় এর দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়। ব্যাংকটির বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ, সঞ্চিত লোকসান ও মূলধন ঘাটতি সাধারণ প্রক্রিয়ায় কাটিয়ে ওঠা কঠিন। ব্যাংকটিকে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার আগের উদ্যোগও সফল হয়নি।

ব্যাংকটির পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সহায়তার প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা দিয়েও ব্যাংকটির মৌলিক সমস্যা সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে নতুন করে অর্থ ঢেলে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে অবসায়নের পথকে বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পদ্মা ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ।

এর আগের বছরের জুনে পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ঋণ পুনঃতফসিল ও এক্সিট কর্মসূচির আওতায় কিছু অর্থ আদায় হওয়ায় খেলাপি ঋণের অনুপাত সামান্য কমেছে। তবে সামগ্রিক আর্থিক সংকট থেকে ব্যাংকটি বেরিয়ে আসতে পারেনি।

পদ্মা ব্যাংকের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার বিপুল অর্থ ব্যাংকটিতে আটকে থাকা। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংকে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বিটিআরসি, মোংলা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংকে জমা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অর্থ দীর্ঘদিন ধরে ফেরত দিতে না পারায় ব্যাংকটির তারল্য সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

২০১৩ সালে ‘দ্য ফার্মারস ব্যাংক’ নামে কার্যক্রম শুরু করে পদ্মা ব্যাংক। কার্যক্রম শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই অনিয়ম, দুর্নীতি, ঋণ অনিয়ম ও তারল্য সংকটে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে ব্যাংকটি টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, নাম পরিবর্তন, মূলধন জোগানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি দ্য ফার্মারস ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে ‘পদ্মা ব্যাংক’ করা হয়। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং আইসিবির মাধ্যমে ব্যাংকটিতে নতুন করে মূলধন জোগান দেওয়া হয়। বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকটিতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকটির সংকটের শুরুতেই যদি অবসায়ন অথবা অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে বাধ্যতামূলক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারত। এখন ব্যাংকটি অবসায়ন করা হলে সঞ্চিত লোকসান ও মূলধন ঘাটতির বড় অংশের দায় সরকারকে বহন করতে হতে পারে।

বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকের ৬০টি শাখা, ১৪টি উপশাখা ও ৬টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে। ব্যাংকটিতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী। ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে আমানতকারী, কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থের কী হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান জানিয়েছেন, ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আমানত ও মূলধনের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে এবং সঞ্চিত লোকসান ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। ঋণ আদায় ছাড়া ব্যাংকটির কার্যক্রমও অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছে।

এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অবসায়ন প্রস্তাবের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে পদ্মা ব্যাংকের পরবর্তী ভবিষ্যৎ। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে ব্যাংকটি বন্ধ করার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে