×
ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন নিয়ম

২০২৬ সেপ্টেম্বর ৩০ ০৯:০৫:৩৬
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে প্রথমবারের মতো ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড (আইসিসি) পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই নির্দেশনায় ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সুদ, জুয়া, অনিশ্চয়তা ও শরিয়াহবহির্ভূত খাতে লেনদেন বন্ধে ব্যাংকগুলোকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট (আইবিআরপিডি) ‘ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড গাইডলাইন্স’ জারি করে। এর ফলে ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডোও নির্ধারিত মডেল অনুসরণ করে শরিয়াহসম্মত ক্রেডিট কার্ড সেবা দিতে পারবে।

নীতিমালায় ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সুদ বা রিবা, জুয়া বা মাইসির এবং অনিশ্চয়তা বা গারার পরিহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কার্ডের লেনদেন ও ফি নির্ধারণে নির্দিষ্ট শরিয়াহসম্মত কাঠামো অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার জন্য দুটি পৃথক শরিয়াহসম্মত মডেলের কথা বলা হয়েছে। এর একটি হলো ‘করজে হাসানা ও উজরাহ’ মডেল এবং অন্যটি ‘কাভার্ড কার্ড বা ক্যাশ-কোলাটেরালাইজড’ মডেল।

জামানতবিহীন কার্ডের ক্ষেত্রে মূলত করজে হাসানা ও উজরাহ মডেল প্রযোজ্য হবে। এ ব্যবস্থায় মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং নগদ অর্থ উত্তোলনকে করজে হাসানা বা সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে গ্রাহককে শুধু নেওয়া মূল অর্থ পরিশোধ করতে হবে এবং ব্যাংক ওই ঋণের ওপর কোনো সুদ বা মুনাফা নিতে পারবে না।

তবে কার্ড ইস্যু, অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মতো সেবার জন্য ব্যাংক ‘ক্যাটাগরি-বি উজরাহ’ বা সার্ভিস ফি নিতে পারবে। এই ফি ব্যাংকের প্রকৃত প্রত্যক্ষ খরচের বেশি হতে পারবে না। এর মধ্যে কোনো মুনাফা যোগ করা যাবে না।এ ছাড়া বকেয়া ঋণের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা বা বিলম্বিত পরিশোধের ভিত্তিতে এই সার্ভিস ফি পরিবর্তন করা যাবে না।

অন্যদিকে, নগদ আমানত বা অন্য কোনো জামানতের বিপরীতে ‘কাভার্ড কার্ড’ বা ‘ক্যাশ-কোলাটেরালাইজড’ কার্ড দেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত জামানতের বিপরীতে লেনদেন নিষ্পত্তি হওয়ায় করজে হাসানা তৈরি হবে না।

ফলে এই মডেলে ব্যাংক ‘ক্যাটাগরি-এ’ সার্ভিস ফি নির্ধারণ করতে পারবে এবং এতে মুনাফার অংশ থাকতে পারে। তবে কার্ডের ধরন অনুযায়ী এই ফি নির্দিষ্ট করতে হবে। ঋণের সীমা বা গ্রাহকের আমানতের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ফি পরিবর্তন করা যাবে না।

ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে শরিয়াহবহির্ভূত খাতে লেনদেন ঠেকাতে ব্যাংকগুলোকে স্বয়ংক্রিয় ‘মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড’ (এমসিসি) ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মদ বিক্রির প্রতিষ্ঠান, জুয়ার প্রতিষ্ঠান, প্রচলিত বিমা, শূকর প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সুদভিত্তিক আর্থিক সেবার মতো নির্দিষ্ট খাতে কার্ডের লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হবে।

প্রতিটি ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটিকে নিষিদ্ধ এমসিসির তালিকা অনুমোদন করতে হবে। একই সঙ্গে এই ফিল্টারিং ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

নীতিমালায় বছরে অন্তত একবার শরিয়াহ অডিটের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ না করলে বিলম্বজনিত অর্থ ব্যাংকের আয় হিসেবে দেখানো যাবে না। তবে আর্থিকভাবে সক্ষম কোনো গ্রাহক ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ না করলে তাকে সময়মতো পরিশোধে উৎসাহিত করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিলম্ব ফি নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এই ফি চুক্তির আগে করা দানের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে আদায় করতে হবে। সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকের মূল আয়ের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। আলাদা দাতব্য অ্যাকাউন্টে জমা রেখে শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত দাতব্য কাজে ব্যয় করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টের পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, দেশে ইসলামী ব্যাংকিং জনপ্রিয় হলেও শরিয়াহভিত্তিক ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার জন্য এতদিন নির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন ছিল না। এ কারণে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো ইসলামী ব্যাংকগুলোও এ খাতে ব্যাপকভাবে এগোতে পারেনি।

তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকিংকে আরও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দিতে ইসলামী ব্যাংক আইন এবং ইসলামী ব্যাংকিং পণ্যের পৃথক গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার কোনো কেন্দ্রীয় গাইডলাইন ছিল না। নতুন এই উদ্যোগের ফলে ব্যাংকগুলো একটি অভিন্ন নীতিমালার আওতায় সেবা দেওয়ার সুযোগ পাবে।

নিজের ব্যাংকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে শরিয়াহ নীতিমালা অনুসরণ করে ‘খিদমাহ’ নামে একটি ক্রেডিট কার্ড চালু রয়েছে এবং এর গ্রাহক চাহিদাও ভালো। তবে উজরাহ মডেলে পরিচালিত হওয়ায় এ ধরনের কার্ডে মূলত প্রসেসিং ও সার্ভিস ফি নেওয়ার সুযোগ থাকে, যার ফলে কিছু ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

নতুন গাইডলাইনের ফলে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড পরিচালনায় ব্যাংকগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হলো। একই সঙ্গে শরিয়াহবহির্ভূত খাতে লেনদেন বন্ধ, সার্ভিস ফি নির্ধারণ এবং বিলম্ব ফি ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর দায়িত্বও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে