×
ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডকে নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় নতুন আলোচনা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৮ ২৩:০২:৪৯
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডকে নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় নতুন আলোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনা ঘিরে দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের পাশাপাশি এবার এই ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে পূবালী ব্যাংক। বড় শাখা ও এটিএম নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী আমানতভিত্তি এবং রিটেইল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কারণে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ব্যবসাটি পূবালীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে সরে এসে করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিংয়ে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সম্ভাব্য ব্যবসা বিক্রির বিষয়ে আগ্রহী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগের খবর পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি, মূল্যায়ন বা লেনদেনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি।

সম্ভাব্য লেনদেনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককেও অবহিত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। তবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা বিক্রির বিষয়ে ব্যাংকটি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। বাজারে এ নিয়ে প্রচলিত আলোচনা বা জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে মন্তব্য না করার কথা জানিয়েছে ব্যাংকটি।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ও কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (সিএমএসএমই) ঋণ পোর্টফোলিও ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর প্রায় ২০ শতাংশ বা ৮ হাজার কোটি টাকা ছিল রিটেইল আমানত।

সম্ভাব্য কোনো লেনদেন হলে এর আওতায় রিটেইল আমানত, ভোক্তা ঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং অন্যান্য রিটেইল ব্যাংকিং সেবা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কম খরচের আমানত, প্রিমিয়াম গ্রাহকভিত্তি, ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্যালারি অ্যাকাউন্টের কারণে এ ব্যবসা সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূবালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণে পূবালী আগ্রহী। এ বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যাংকটির উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনার অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল গ্রাহক ও সেবার ধরন পূবালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবসায়িক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে তুলনামূলক কম খরচের আমানত ও প্রিমিয়াম গ্রাহকভিত্তি বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসাটি পূবালীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এই পোর্টফোলিও অধিগ্রহণ করা সম্ভব হলে পূবালী ব্যাংকের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং আর্থিক সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূবালী ব্যাংক রিটেইল ব্যাংকিং, কার্ড, ডিজিটাল ব্যাংকিং, কিউআর পেমেন্ট ও সেলফ-সার্ভিস ব্যাংকিংয়ে গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে রিটেইল ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণকে ব্যবসা বৃদ্ধির অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অবকাঠামোগত দিক থেকেও পূবালী ব্যাংকের বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশে বর্তমানে ১৮টি শাখা রয়েছে। বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের শাখা ৫০০টির বেশি এবং উপশাখা ২৮০টির বেশি। সম্প্রতি ব্যাংকটি তাদের এক হাজারতম এটিএম/সিআরএম চালু করেছে।

ফলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসার কোনো অংশ পূবালী অধিগ্রহণ করতে পারলে দেশজুড়ে থাকা নিজস্ব শাখা, উপশাখা ও এটিএম নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রিটেইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল সেবাতেও পূবালী ব্যাংক সম্প্রসারণ করছে। ব্যাংকটির ‘পিআই’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০২৫ সালের শেষে প্রায় ৫ লাখ ২৮ হাজারে পৌঁছায়। একই বছরে প্ল্যাটফর্মটিতে ১ কোটি ৮৬ লাখের বেশি লেনদেন হয়েছে বলে ব্যাংকটির প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।

বড় পরিসরের রিটেইল ব্যবসা পরিচালনায় ডিজিটাল অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ সক্ষমতাও সম্ভাব্য অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পূবালীর জন্য বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।

পূবালী ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতাও বড় আকারের রিটেইল পোর্টফোলিও অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ১৪ কোটি টাকা। একই সময়ে আমানত দাঁড়ায় ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা।

২০২৫ সালে পূবালী ব্যাংকের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা এবং রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) ছিল ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। বছরের শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ২০ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটি প্রায় ৬৮৫ কোটি টাকা সমন্বিত মুনাফা করেছে।

বিশ্বজুড়ে কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি দেশে তাদের কার্যক্রম কমিয়েছে বা নির্দিষ্ট ব্যবসা থেকে সরে এসেছে। অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়েসহ কয়েকটি দেশে ব্যাংকটির কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানা গেছে। শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া ও আইভরিকোস্টেও কনজ্যুমার ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ বা বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশেও রিটেইল ব্যাংকিং কমিয়ে করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিংয়ে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনাকে সেই বৈশ্বিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে এইচএসবিসিও বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম কমিয়ে করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।

বাংলাদেশে রিটেইল ব্যবসা বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে জানান, রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা নিয়ে বাজারে প্রচলিত গুজব বা জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে ব্যাংকটি কোনো মন্তব্য করবে না।

ব্যাংকটি আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং এই মুহূর্তে ব্যাংকিং সেবা ও কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন নেই। ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং দেশটির প্রতি ব্যাংকটির প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রয়েছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে