×
ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা কাটাতে কেন লাগবে ৫ বছর, জানালেন বিশেষজ্ঞরা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৮ ১০:০০:২৮
ডেঙ্গুর ভয়াবহতা কাটাতে কেন লাগবে ৫ বছর, জানালেন বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই নতুন করে বহু মানুষ মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে ডেঙ্গুকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে ধারাবাহিকভাবে অন্তত পাঁচ বছর কাজ করতে হতে পারে। তবে এই সময়সীমা নির্ভর করবে কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে, তা কতটা বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর নজরদারি রাখা যাচ্ছে তার ওপর। সঠিক ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা না থাকলে সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মনে করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বছরজুড়েই কার্যক্রম চালাতে হবে। তার মতে, শুধু ডেঙ্গুর মৌসুমে অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ভারতের কলকাতায় মশা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সমন্বিত উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

অধ্যাপক কবিরুল বাশারের ভাষ্য, দেশে এডিস মশার লার্ভার বিস্তৃতি এতটাই বেশি যে পুরো দেশই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া যাচ্ছে। তার মতে, কমিউনিটির মানুষকে সম্পৃক্ত করা, মশার বিস্তার ও রোগীর ওপর নজরদারি, গবেষণা, মাঠপর্যায়ে গবেষণার ফল প্রয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কার্যকর কীটনাশকের ব্যবস্থা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৩ হাজার ৬৯৪ জন এবং মারা গেছেন ২২৫ জন। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ হাজার ১৫৮ জন আক্রান্ত এবং ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের বড় একটি অংশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শনাক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি মৃত্যুহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কর্মক্ষম বয়সী মানুষ, শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বিশেষ ঝুঁকিতে থাকার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডেঙ্গুর ভয়াবহতার একটি উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রামের মনি আকতারের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারার আশঙ্কায় পরিবার তাকে বাড়িতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অ্যাম্বুলেন্সে তোলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। তার আট বছর বয়সী ছেলেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল; চিকিৎসার পর সে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনও। তার মতে, স্থানীয় বাসিন্দা, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি কার্যক্রমের ফল নিয়মিত মূল্যায়ন, সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না করে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন। এর সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি, তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ, জনসম্পৃক্ততা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রয়োগের সমন্বয় করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কলকাতায় মশা নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। সম্ভাব্য প্রজননস্থল শনাক্ত করতে প্রযুক্তি, লার্ভিসাইড ও ডেটাবেজ ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার যৌথ অভিযান, জনসচেতনতা এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালে কলকাতায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিতে পরিবর্তন ও জোরদার করা হয়।

প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কলকাতায় ১৩ হাজার ৯২৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন এলাকায় রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৩৯ জন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম।

অধ্যাপক কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরে মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এখন আর বিচ্ছিন্ন বা মৌসুমভিত্তিক অভিযান যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে শীতকালে মশার সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও ওই সময়েই প্রজননস্থল ধ্বংস ও নজরদারি বাড়ানো গেলে পরবর্তী মৌসুমে সুফল পাওয়া যেতে পারে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশীদ জানিয়েছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কাজ চলছে। তবে পরিস্থিতি ঠিক কতদিনে নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ও ডেঙ্গুর বিস্তারে প্রভাব ফেলে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

ফলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু আক্রান্তের চিকিৎসার পাশাপাশি বছরজুড়ে মশা নিয়ন্ত্রণ, প্রজননস্থল ধ্বংস, তথ্যভিত্তিক নজরদারি, গবেষণা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে