×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকার মেগা প্রজেক্টে চীন আউট, জাপান ইন

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৫ ১৫:২৯:৫০
ঢাকার মেগা প্রজেক্টে চীন আউট, জাপান ইন

নিজস্ব প্রতিবেদক: এশিয়ার ভূরাজনীতি ও অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ খাতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতাও দীর্ঘদিনের। তবে একই সময়ে জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে একাধিক দেশের স্বার্থ ও অংশগ্রহণ এখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশ উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, কৃষি, মানবসম্পদ ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সমঝোতা ও চুক্তি করে। যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং বহুমুখী বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনের কথাও জানিয়েছে।

বাংলাদেশের অবকাঠামো ও শিল্প খাতে চীনা প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়নের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, বন্দর, শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। ২০২৬ সালের চীন সফরেও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে কোনো দেশের সঙ্গে বড় ধরনের সহযোগিতা থাকলেই সব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকল্পের অর্থায়ন, দরপত্র, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জমি অধিগ্রহণ, প্রশাসনিক অনুমোদন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তসহ নানা বিষয় বাস্তবায়নের গতিকে প্রভাবিত করে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ২০টি চীনা J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার জন্য প্রায় ২.৩০২ বিলিয়ন ডলারের একটি খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কমিটি চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করেছে। অর্থাৎ এটিকে সম্পন্ন ক্রয়চুক্তি হিসেবে না দেখে প্রস্তাব ও আলোচনার পর্যায়ের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে ঢাকার গণপরিবহন অবকাঠামোয় জাপানের দীর্ঘমেয়াদি অংশগ্রহণ রয়েছে। MRT Line-1 প্রকল্পটি জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা JICA-এর অর্থায়নে এগোচ্ছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সরকারি নথিতে Line-1-এর একটি দরপত্রকে JICA অর্থায়িত প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই মাসে একনেকও সংশোধিত MRT Line-1 প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার অর্থায়নে জাপানের ভূমিকা রয়েছে।

ফলে এই প্রকল্পকে শুধু চীন ও জাপানের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার আগে প্রকল্পের নিজস্ব অর্থায়ন কাঠামো ও দরপত্র প্রক্রিয়াও বিবেচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা ও জাপানি প্রতিষ্ঠান কখনো একই ধরনের কাজের জন্য প্রতিযোগিতায় থাকতে পারে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দরপত্রকে সরাসরি চীন-জাপান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের স্থানীয় সংস্করণ হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট দরপত্র, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান এবং অর্থায়ন চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।

JICA নিজস্ব নথিতে বাংলাদেশের পরিবহন অবকাঠামো, বিশেষ করে MRT Line-1, Line-5 ও Line-6-এর উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কথা জানিয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক শুধু চীন বা জাপানকে কেন্দ্র করে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিমান চলাচল, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের আলাদা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখার নীতি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের একটি বিশ্লেষণেও তারেক রহমানের চীন সফরকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা হয়েছে।

তাই বর্তমানে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেয়ে বলা যায়, সম্পর্কের পরিধি বাড়লেও বাংলাদেশের অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে সমান্তরাল যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থনৈতিক সুবিধা, প্রকল্পের গুণগত মান, ঋণের শর্ত, প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করা।

একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে কীভাবে বহুমুখী সহযোগিতা ধরে রাখা যায়—সেটিই ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমীকরণ।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন অংশীদারের উপস্থিতি দেশটির জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনো নির্দিষ্ট ‘ব্লক’-এর দিকে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখার চেয়ে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থকে সমন্বয় করার একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে