×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘে অংশ নেননি কিম-পুতিন-মোদীসহ ৫০ বিশ্বনেতা, নেপথ্যে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৫ ১৫:২৩:০০
জাতিসংঘে অংশ নেননি কিম-পুতিন-মোদীসহ ৫০ বিশ্বনেতা, নেপথ্যে

নিজস্ব প্রতিবেদক: নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা অংশ নিলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবার সরাসরি উপস্থিত নেই। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের হিসাবে, ৫০ জনের বেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবারের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন না। অনুপস্থিতদের তালিকায় রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎসসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান নিউইয়র্কে জড়ো হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আলাদা করে নজর কেড়েছে।

পুতিনের অনুপস্থিতি

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০১৫ সালের পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সরাসরি উপস্থিত হননি। এবারের অধিবেশনেও তিনি নিউইয়র্কে যাননি। রাশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। পুতিনের আন্তর্জাতিক সফর সীমিত থাকার পেছনে ইউক্রেন যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক আইনি পরিস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এবারের অনুপস্থিতির একক কারণ হিসেবে কোনো একটি বিষয়কে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।

শি জিনপিং কেন নেই?

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও এবারের সাধারণ পরিষদে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না। তাঁর পরিবর্তে চীনের প্রতিনিধিত্ব করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং। একই সময়ে শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। ফলে চীনা নেতৃত্বের দৃষ্টিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও এবারের কূটনৈতিক সূচিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে শি জিনপিংয়ের অনুপস্থিতিকে জাতিসংঘের প্রতি চীনের ‘আস্থা হারানোর প্রমাণ’ হিসেবে সরাসরি ঘোষণা করা যায় না। বরং চীন একই সময়ে জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যেও সক্রিয় রয়েছে এবং এবারের অধিবেশনে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে।

মোদির অনুপস্থিতিও আলোচনায়

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না। ভারতীয় প্রতিনিধিদল অবশ্য অধিবেশনে রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মোদির অনুপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও এর নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে প্রকাশ্য সূত্রে একক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ভারত একই সময়ে কোয়াড, ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। তবে শুধু এই অনুপস্থিতির ভিত্তিতে ভারত জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতি এমন সময়ে ঘটছে, যখন ইউক্রেন, গাজা, ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বিভাজন স্পষ্ট। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও তাঁর শেষ সাধারণ পরিষদ ভাষণে যুদ্ধ বন্ধ, এআই নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে একক শক্তির পরিবর্তে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের প্রভাব বাড়ছে। ব্রিকস, এসসিও, কোয়াডসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় জোটের কার্যক্রমও সেই পরিবর্তিত কূটনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তবে এসব জোটের সক্রিয়তা জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন কোনো সরাসরি সিদ্ধান্ত এখনই টানা যায় না।

এবারের অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতির পাশাপাশি অনুপস্থিতিও আলোচনায় এসেছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ একাধিক দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদে মতপার্থক্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেসও প্রতিষ্ঠানটির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করার দাবি বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে।

তবে ৫০ জনের বেশি নেতা অনুপস্থিত থাকলেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে শতাধিক দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। ফলে এবারের অনুপস্থিতিকে জাতিসংঘের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার চেয়ে, বর্তমান বৈশ্বিক কূটনীতিতে পরিবর্তিত অগ্রাধিকার ও বহুমুখী কূটনৈতিক কাঠামোর একটি লক্ষণ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।

বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত, ইউরোপ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। জাতিসংঘের মঞ্চের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, আঞ্চলিক জোট ও অন্যান্য বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মও এখন কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

এ কারণে এবারের সাধারণ পরিষদে পুতিন, শি জিনপিং ও মোদির অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করলেও, এর অর্থ জাতিসংঘের বিকল্প কোনো বিশ্বব্যবস্থা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে