×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০২৭-এ বিদেশে পড়তে যাওয়ার বাজেট গাইডলাইন

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৫ ১৫:১৮:৪০
২০২৭-এ বিদেশে পড়তে যাওয়ার বাজেট গাইডলাইন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশে উচ্চশিক্ষা এখন বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, টিউশন ফি, থাকা-খাওয়া, ভিসা, স্বাস্থ্যবিমা, বিমানভাড়া—সব মিলিয়ে বিদেশে পড়াশোনার জন্য বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য আগে থেকেই পূর্ণাঙ্গ বাজেট তৈরি না করলে পরবর্তীতে আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে সঠিক পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, স্কলারশিপের চেষ্টা এবং বৈধ অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারলে সীমিত বাজেটেও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

বিদেশে পড়াশোনার বাজেট তৈরির সময় মূলত তিনটি বড় খাতকে গুরুত্ব দিতে হয়—টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভিসা-স্বাস্থ্যবিমা-যাতায়াতের মতো অতিরিক্ত খরচ।

টিউশন ফি: বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সভেদে টিউশন ফির পার্থক্য অনেক বেশি হতে পারে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই খরচ নির্ধারিত হয়।

লিভিং কস্ট: বিদেশে পড়তে গেলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি নয়, আবাসন, খাবার, স্থানীয় যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি, মোবাইল ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচের জন্যও আলাদা বাজেট রাখতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মোট খরচের বড় অংশই জীবনযাত্রার ব্যয়ে চলে যায়।

ভিসা, স্বাস্থ্যবিমা ও বিমানভাড়া: ভিসা আবেদন, স্বাস্থ্যবিমা, মেডিকেল পরীক্ষা, ডকুমেন্ট প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশ থেকে গন্তব্য দেশে যাওয়ার বিমানভাড়াও প্রাথমিক বাজেটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যের সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয়ের ধারণা নেওয়া যেতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়, শহর, কোর্স, আবাসনের ধরন ও জীবনযাত্রার ওপর প্রকৃত খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কম-বেশি হতে পারে।

জার্মানি: বছরে আনুমানিক ১৩ থেকে ১৮ লাখ টাকা। অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি তুলনামূলক কম বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে না থাকলেও সেমিস্টার ফি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

মালয়েশিয়া: বছরে আনুমানিক ১০.৫ থেকে ২৭ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সের ওপর ভিত্তি করে টিউশন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে পার্থক্য হয়। তুলনামূলক কম খরচে বিদেশে পড়াশোনার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের কাছে দেশটি আকর্ষণীয় হতে পারে।

যুক্তরাজ্য: বছরে প্রায় ৩৪ থেকে ৫৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। কোর্স, বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরভেদে খরচের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি: বছরে আনুমানিক ১৮ থেকে ৪৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রার ধরন অনুযায়ী প্রকৃত ব্যয় পরিবর্তিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি: বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৮৬ লাখ টাকা বা তারও বেশি ব্যয় হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ টিউশন ফি এবং বড় শহরের জীবনযাত্রার ব্যয় মোট বাজেটকে অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাজেট সীমিত হলে প্রথমেই স্কলারশিপের সুযোগ খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান মেধা, ফলাফল, গবেষণা, দক্ষতা বা অন্যান্য যোগ্যতার ভিত্তিতে পূর্ণ বা আংশিক অর্থায়নের সুযোগ দেয়। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ ও ফান্ডিংয়ের শর্ত ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।

ব্যাংক এডুকেশন লোনও কিছু শিক্ষার্থীর জন্য অর্থায়নের একটি সম্ভাব্য মাধ্যম হতে পারে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকের শিক্ষা ঋণের পণ্য ও শর্ত এক নয়। তাই ঋণের সুদ, পরিশোধের সময়, জামানত, অভিভাবকের আয় এবং অন্যান্য যোগ্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গন্তব্য নির্বাচন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং নয়, টিউশন ফি, শহরের বাসাভাড়া, খাবারের খরচ, পরিবহন এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় হিসাব করে দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করা উচিত।

অনেক দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট শর্তে পার্ট-টাইম কাজের অনুমতি রয়েছে। এর মাধ্যমে দৈনন্দিন খরচের একটি অংশ সামলানো সম্ভব হতে পারে। তবে কাজের সুযোগ, অনুমোদিত সময় এবং শিক্ষার্থীর ভিসার শর্ত দেশভেদে আলাদা। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি নিয়ম যাচাই করা জরুরি।

শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, পার্ট-টাইম কাজকে বিদেশে যাওয়ার প্রাথমিক অর্থের বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। প্রথম কয়েক মাসের টিউশন, বাসা, খাবার ও জরুরি খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

বিদেশে টিউশন ফি বা অন্যান্য শিক্ষাসংক্রান্ত খরচ পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার, ইনভয়েস এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকভাবে সংরক্ষণ করে অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোই নিরাপদ পদ্ধতি।

বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতিতে IELTS বা অন্যান্য ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষার খরচও রয়েছে। পরীক্ষা দেওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া গেলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে একাধিকবার পরীক্ষা দেওয়ার খরচ এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন ফি, ডকুমেন্ট অনুবাদ বা সত্যায়ন, মেডিকেল পরীক্ষা, ভিসা আবেদন, বায়োমেট্রিকস এবং বিমানভাড়ার মতো খরচগুলোও আগে থেকে হিসাবের মধ্যে রাখা উচিত।

ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব ও অর্থের উৎসের তথ্য সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়ে আর্থিক সক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে সেই অর্থের বৈধ উৎস ও ব্যাখ্যা যথাযথভাবে দেখানো না গেলে।

তাই ভিসা আবেদনের অনেক আগে থেকেই নিয়মিত ও স্বচ্ছ আর্থিক রেকর্ড রাখা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের বৈধ উৎসের প্রমাণ সংরক্ষণ করা ভালো। সংশ্লিষ্ট দেশের সর্বশেষ ভিসা নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আর্থিক নথি প্রস্তুত করা উচিত।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শুধু টিউশন ফি জোগাড় করলেই হয় না; পুরো শিক্ষাজীবনের সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা থাকা প্রয়োজন। কোন দেশে পড়বেন, কোন বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেবেন, স্কলারশিপের সুযোগ কতটা, জীবনযাত্রার খরচ কত এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য কত টাকা হাতে রাখা হবে—এসব বিষয় আগে থেকেই হিসাব করা দরকার।

সঠিক গবেষণা, বৈধ অর্থায়ন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং বাস্তবসম্মত বাজেট পরিকল্পনা থাকলে মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরাও বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, দূতাবাস/ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এবং ব্যাংকের সর্বশেষ নিয়ম ও খরচ যাচাই করা জরুরি।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে