×
ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিপিসির গলার কাঁটা পাঁচ ইসলামী ব্যাংক, আটকে ১৩৫৫ কোটি টাকা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১৭:৩৬:৫৩
বিপিসির গলার কাঁটা পাঁচ ইসলামী ব্যাংক, আটকে ১৩৫৫ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি সিদ্ধান্তে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে গিয়ে তহবিল সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং দেশে নির্ধারিত দামে জ্বালানি সরবরাহের কারণে গত কয়েক মাসে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে। এর মধ্যে বিভিন্ন সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিপিসির বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকায় আমদানি বিল পরিশোধেও চাপ তৈরি হয়েছে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অবরুদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে থাকা পাঁচ ব্যাংকেই আটকে আছে প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা।

বিপিসি বলছে, এসব অর্থ দ্রুত ছাড় করা গেলে জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধে তৈরি হওয়া চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

বিপিসির হিসাবে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে—৭৫৩ কোটি টাকা।এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংকে ২২৭ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ২০৯ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১০ কোটি এবং এক্সিম ব্যাংকে ১৫৭ কোটি টাকা রয়েছে।

অর্থাৎ এই পাঁচ ব্যাংকে বিপিসির মোট আটকে থাকা অর্থ প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা।এর বাইরে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে প্রায় ২২ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকে ১৪৮ কোটি, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকে ১৩৩ কোটি এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কাছে ২২৯ কোটি টাকা অবরুদ্ধ রয়েছে।

বিপিসির তহবিল সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলে ভর্তুকির বিষয়টি উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরি অনুসরণ না করায় গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।

এর প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির নগদ অর্থের ওপরও। বিপিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির হাতে জমা অর্থ ছিল ৩৭ হাজার ২৮৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। ধারাবাহিক লোকসানের পর ১৩ সেপ্টেম্বর সেই অর্থ কমে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৭৯০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।এর মধ্যে ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকায় তা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না বিপিসি।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপিসিকে সাধারণত প্রায় দুই মাসের জ্বালানি তেলের মূল্য সমপরিমাণ অর্থ চলতি মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা।

বিপিসির একটি চিঠিতে জানানো হয়েছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের ৪০টি এলসির বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে রাখা হয়েছে। এরপরও এসব এলসির বিপরীতে আরও ১ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।এই ঘাটতি পূরণে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অবমুক্ত করে সমন্বয়ের অনুরোধ করেছে বিপিসি।

ভর্তুকির চাপ সামলাতে সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরি অনুসরণ করা হলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারত। দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণের পরও সরকারকে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।

বিপিসির পরিচালক (অর্থ) নাজনীন পারভীন জানিয়েছেন, জ্বালানি আমদানি বিল পরিশোধের জন্য আটকে থাকা অর্থ ছাড়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার বিপিসিকে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিপিসির ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার বেশি আটকে রয়েছে। এসব অর্থ ছাড় এবং সরকারের নির্ধারিত ভর্তুকি পাওয়া গেলে তহবিলের চাপ অনেকটাই কমবে বলে আশা করছে বিপিসি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যায়েই নয়, সরকারের উচ্চপর্যায়েও আলোচনা হচ্ছে।

ফলে জ্বালানি আমদানি নির্বিঘ্ন রাখা এবং বিপিসির চলতি মূলধনের চাপ কমাতে আটকে থাকা অর্থ কীভাবে ও কত দ্রুত অবমুক্ত করা হবে, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে