×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ভয়ংকর হিসাব সামনে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১৯:০৪:০৫
জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ভয়ংকর হিসাব সামনে

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোয় বিদেশি নির্ভরতা এবং এর সম্ভাব্য জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ আমদানির পরিমাণ, বিকল্প আন্তর্জাতিক সংযোগের সক্ষমতা এবং দেশের নিজস্ব সাবমেরিন কেবল অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিশ্লেষকেরা।

বাংলাদেশের মোট ব্যান্ডউইথের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এই নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে ব্যান্ডউইথ আমদানি এবং দেশের মোট ইন্টারনেট ট্রাফিক—দুটি বিষয় এক নয়। ফলে ভারতের মাধ্যমে আসা ব্যান্ডউইথের পরিমাণকে সরাসরি বাংলাদেশের মোট ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

ভারতের ওপর এই নির্ভরতাকে ‘ট্রোজান হর্স’ বা ডিজিটাল ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যুক্তি দেওয়া হয়েছে, কোনো একটি দেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে রাজনৈতিক বা প্রযুক্তিগত কারণে সেই সংযোগ ব্যাহত হলে দেশের ইন্টারনেট সেবা ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

তবে ভারত একতরফাভাবে বাংলাদেশের পুরো ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে পারে—এমন দাবি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব সাবমেরিন কেবল, আন্তর্জাতিক গেটওয়ে, স্থলভিত্তিক সংযোগ এবং অন্যান্য ব্যাকআপ ব্যবস্থার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

ভারতের ভূখণ্ড বা নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ডেটা চলাচল করলে তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও হয়েছে।

বিশেষ করে সরকারি যোগাযোগ, ব্যবসায়িক তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও অন্যান্য সংবেদনশীল ডেটার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহারের সময় সাইবার নিরাপত্তা, এনক্রিপশন এবং ডেটা সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নেটওয়ার্ক দিয়ে ডেটা গেলেই সেই দেশের পক্ষে তা ‘অনায়াসে’ সংগ্রহ করা সম্ভব—এমন সরল সিদ্ধান্ত প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক নয়। ডেটার এনক্রিপশন, নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার, সার্ভিস প্রোভাইডার এবং আইনগত কাঠামোর মতো বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের ব্যান্ডউইথের জন্য বছরে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। ভবিষ্যতে দেশের ব্যান্ডউইথের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয় কয়েকগুণ বাড়তে পারে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০৩৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৪৩২ টেরাবাইটে পৌঁছানোর এবং এ খাতে বার্ষিক ব্যয় ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ডলারে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এসব পূর্বাভাসের ভিত্তি, ‘টেরাবাইট’ বলতে নির্দিষ্ট সময়ের মোট ডেটা নাকি ব্যান্ডউইথ ক্যাপাসিটি বোঝানো হয়েছে, এবং ব্যয়ের হিসাব কীভাবে করা হয়েছে—তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

একটি দেশের জন্য আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগে একাধিক স্বাধীন পথ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সাবমেরিন কেবল, স্থলভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং অন্যান্য ব্যাকআপ রুট যত বৈচিত্র্যময় হবে, একটি নির্দিষ্ট পথ বা দেশের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি তত কমবে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সাবমেরিন কেবল অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ভবিষ্যতে আরও সাবমেরিন কেবল, আন্তর্জাতিক গেটওয়ে, ডেটা সেন্টার ও শক্তিশালী জাতীয় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে আন্তর্জাতিক সংযোগে স্থিতিশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

ইন্টারনেট এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অবকাঠামোয় অতিরিক্ত নির্ভরতা কোনো দেশের জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ভারতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে দেশের বিদ্যমান সাবমেরিন কেবল, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা, স্থলভিত্তিক সংযোগ ও ব্যাকআপ অবকাঠামোর পূর্ণ চিত্র বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতার মূল জায়গাটি তাই একটি দেশের ওপর নির্ভরতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সংযোগে বৈচিত্র্য ও বিকল্প সক্ষমতা তৈরি করা। নিজস্ব সাবমেরিন কেবল, ডেটা সেন্টার এবং শক্তিশালী জাতীয় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো গড়ে তোলা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর সর্বশেষ খবর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি - এর সব খবর



রে