×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক ক্লিকে ৩০০ খবর, আ.লীগের অপপ্রচারের রহস্য ফাঁস

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১০:৩৬:২৩
এক ক্লিকে ৩০০ খবর, আ.লীগের অপপ্রচারের রহস্য ফাঁস

নিজস্ব প্রতিবেদক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি রাজনৈতিক অপপ্রচার ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর নতুন ঝুঁকিও সামনে আসছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে এমনই একটি এআইনির্ভর অপপ্রচারের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার দাবি উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের তৈরি চ্যাটবট ‘ক্লড’ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ভুয়া রাজনৈতিক কনটেন্ট তৈরির একটি কর্মকাণ্ড অনুসন্ধানে উঠে এসেছে । অভিযোগ অনুযায়ী, গাইবান্ধার এক ব্যক্তি গত প্রায় এক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ভুয়া শিরোনাম এবং প্রায় ৩০০টি কাল্পনিক রাজনৈতিক খবর তৈরি করেন। এসব কনটেন্ট শুধু বিচ্ছিন্নভাবে তৈরি করা হয়নি; বরং পাইথন স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে তুলনামূলক দ্রুত ও বড় পরিসরে কনটেন্ট তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পরে এসব ভুয়া তথ্য ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, প্রচলিত পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তি যত সময় নিয়ে একটি ভুয়া খবর লিখতে পারতেন, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে সেই কাজ অনেক দ্রুত এবং বড় পরিসরে করা সম্ভব হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য বা গুজবকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে একাধিক শিরোনাম, খবরের কাঠামো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপযোগী পোস্ট তৈরি করা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এই সুবিধাটিই কাজে লাগিয়েছিলেন। ফলে ভুয়া তথ্য তৈরির ক্ষেত্রে শুধু মানুষের শ্রম নয়, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহারও যুক্ত হয়েছে। এতে একই ধরনের বিভ্রান্তিকর বার্তা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও উপস্থাপনায় ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে প্রকৃত তথ্য ও কৃত্রিমভাবে তৈরি প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য করা আরও কঠিন করে তোলে।

এই প্রচারণার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা। ভুয়া খবর ও অতিরঞ্জিত শিরোনামের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উগ্রপন্থী, সহিংস বা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘তালেবান-স্টাইল’ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে—এমন ভয় বা আতঙ্ক তৈরি করাও এই প্রচারণার একটি কৌশল ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার আগে স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।

এআই ব্যবহারের এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ এখানে প্রযুক্তি শুধু তথ্য তৈরির হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং একটি সম্ভাব্য সমন্বিত রাজনৈতিক প্রচারণার অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত বেশি আকর্ষণীয়, উত্তেজনাপূর্ণ বা বিতর্কিত কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে ‘ব্রেকিং’, ‘চাঞ্চল্যকর’, ‘গোপন তথ্য ফাঁস’ কিংবা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগের মতো শিরোনাম সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। এআই সেই ধরনের কনটেন্ট দ্রুত তৈরি করতে পারলে অপপ্রচারের গতি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। একটি মিথ্যা তথ্য প্রথমে কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত হলেও পরে সেটি অসংখ্য পেজ, ভিডিও, শর্টস বা পোস্টের মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন একই দাবি বারবার চোখে পড়ার কারণে অনেক ব্যবহারকারী সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

অ্যানথ্রপিকের পক্ষ থেকে এ ধরনের অপব্যবহারের বিষয়টি শনাক্ত ও প্রকাশ করার ঘটনা তাই প্রযুক্তি নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এআই প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, উন্নত এআই মডেলগুলো শুধু লেখালেখি বা সাধারণ তথ্য তৈরির কাজে নয়, বরং সাইবার কার্যক্রম, সামাজিক প্রকৌশল এবং প্রভাব বিস্তারের মতো ক্ষেত্রেও অপব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণায় এআই ব্যবহারের ঝুঁকি হলো—একজন ব্যক্তি খুব অল্প সময় ও তুলনামূলক কম সম্পদ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন। এর ফলে আগে যে ধরনের অপপ্রচারের জন্য বড় একটি সংগঠিত দল প্রয়োজন হতো, ভবিষ্যতে তার কিছু অংশ ছোট একটি গোষ্ঠী বা একক ব্যক্তিও পরিচালনা করতে সক্ষম হতে পারেন।

তবে এই ঘটনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এআই দিয়ে কোনো ভুয়া রাজনৈতিক কনটেন্ট তৈরি করা এবং সেই কনটেন্টের মাধ্যমে বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। একটি কনটেন্ট কত মানুষের কাছে পৌঁছেছে, কতজন সেটিকে বিশ্বাস করেছে, কতটা রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করেছে এবং এর পেছনে অন্য কোনো সংগঠন বা অর্থায়ন ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর আলাদা তদন্তের বিষয়। একইভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা, রাজনৈতিক দল বা বিদেশি শক্তি এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল কি না, সেটিও প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই এই ঘটনায় এআইয়ের ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর পরিবেশে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর অপপ্রচার আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নির্বাচন, রাজনৈতিক আন্দোলন, সরকারবিরোধী কর্মসূচি কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মতো সময়ে একটি মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তার বাস্তব সামাজিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। কোনো রাজনৈতিক নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন, কোনো দল নিষিদ্ধ হয়েছে, কোনো এলাকায় সহিংসতা হয়েছে কিংবা কোনো বিদেশি শক্তি গোপনে হস্তক্ষেপ করছে—এমন মিথ্যা দাবি কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে তথ্যটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও প্রথমবার তৈরি হওয়া আতঙ্ক বা ক্ষতি সবসময় পুরোপুরি ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে