×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লুটপাট, অনিয়ম ও আস্থার সংকটে ১৩ জীবন বিমা কোম্পানি

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৮ ১৫:২৬:০৫
লুটপাট, অনিয়ম ও আস্থার সংকটে ১৩ জীবন বিমা কোম্পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের জীবন বিমা খাতে সামগ্রিক ব্যবসা বাড়লেও ১৩টি কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতিতে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও জীবন তহবিল—দুই সূচকেই অবনতি হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে একই সঙ্গে ব্যবসা ও জীবন তহবিল কমে যাওয়ার বিষয়টিকে ‘ক্যানসারে আক্রান্ত’ হওয়ার সঙ্গে তুলনা করছেন জীবন বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি জীবন তহবিলও কমতে থাকা মোটেও স্বাভাবিক নয়। বিষয়টি অনেকটা শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধার মতো। শুরুতেই রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা করা না হলে যেমন তা ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি বিমা কোম্পানিগুলোর সমস্যাও দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো বিমা খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ব্যবসা ও জীবন তহবিল—উভয় ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক সংকোচনের তালিকায় রয়েছে সমস্যাগ্রস্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, গোল্ডেন লাইফ ও বায়রা লাইফ। একই তালিকায় রয়েছে মেঘনা লাইফ, পপুলার লাইফ, রূপালী লাইফ ও প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এছাড়া হোমল্যান্ড লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, সান লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ ও প্রটেকটিভ লাইফও এ সংকটে রয়েছে।

কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ব্যবসা ও জীবন তহবিল কমে যাওয়ার পেছনে অতীতে কিছু জীবন বিমা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ লুটপাটের বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এর ফলে কয়েকটি কোম্পানি গ্রাহকদের বিমা দাবির অর্থ যথাসময়ে পরিশোধ করতে পারছে না। এতে জীবন বিমা খাতের প্রতি মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নতুন বিমা ব্যবসায়ও। মানুষ বিমা করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও জীবন বিমা ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে অনেক কোম্পানির নতুন ব্যবসা কমেছে। কিন্তু ব্যবসা কমে গেলেও পুরোনো গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধ করতে হয়েছে। এতে কোম্পানিগুলোর জীবন তহবিল থেকে অর্থ বের হয়ে যাওয়ায় তহবিলও কমেছে।

সামগ্রিকভাবে জীবন বিমা খাতের ব্যবসা বেড়েছে

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ১০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে সামগ্রিক জীবন বিমা খাতের ব্যবসা বেড়েছে ৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।

তবে খাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেও বেশ কয়েকটি কোম্পানি বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার পাশাপাশি কমেছে জীবন তহবিলও।

মেঘনা লাইফের ব্যবসা কমেছে ১৩৯ কোটি টাকা

মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির মোট প্রিমিয়াম আয় বা ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৪২২ কোটি টাকা। ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২৮৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরে কোম্পানিটির ব্যবসা কমেছে ১৩৯ কোটি টাকা।

একই সময়ে জীবন তহবিলেও বড় ধরনের সংকোচন হয়েছে। ২০২০ সালে মেঘনা লাইফের জীবন তহবিল ছিল ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরে জীবন তহবিল কমেছে ৩২০ কোটি টাকা।

পপুলার লাইফেও ব্যবসা ও তহবিল কমেছে

ব্যবসা ও জীবন তহবিল—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক পরিবর্তনের মুখে পড়েছে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৫৯১ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে ব্যবসা বেড়ে ৬৭৭ কোটি টাকায় উঠলেও পরবর্তী সময়ে তা কমে ২০২৫ সালে ৫০১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে ব্যবসা কমেছে ১৭৬ কোটি টাকা এবং ২০২০ সালের তুলনায় ছয় বছরে কমেছে ৯০ কোটি টাকা।

কোম্পানিটির জীবন তহবিলেও একই ধরনের অবনতি দেখা গেছে। ২০২০ সালে জীবন তহবিল ছিল ১ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরে জীবন তহবিল কমেছে ২৬০ কোটি টাকা।

ফারইস্ট লাইফে ব্যবসায় বড় ধস

সমস্যাগ্রস্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসায়ও বড় ধরনের পতন হয়েছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৯৭৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮৩ কোটি টাকায়।

কোম্পানিটির জীবন তহবিলের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২০ সালে ফারইস্ট লাইফের জীবন তহবিল ছিল ২ হাজার ৩ কোটি টাকা। সেখান থেকে কমে ২০২৫ সালে তা ঋণাত্মক ৮৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

প্রাইম লাইফের ব্যবসা কমেছে ২৬ কোটি টাকা

প্রাইম লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০২০ সালের ব্যবসা ছিল ৪১৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ৩৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে ব্যবসা কমেছে ২৬ কোটি টাকা।

একই সময়ে কোম্পানিটির জীবন তহবিল ৮৩৭ কোটি টাকা থেকে কমে ৭৪৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

রূপালী লাইফের জীবন তহবিলে পরিবর্তন নেই

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসাও কমেছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা ছিল ২৪৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১৫ কোটি টাকায়।

তবে ব্যবসা কমলেও জীবন তহবিলে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০২০ সালে কোম্পানিটির জীবন তহবিল ছিল ৫০৫ কোটি টাকা, ২০২৫ সালেও তা ৫০৫ কোটি টাকাই রয়েছে।

সানফ্লাওয়ার লাইফের ব্যবসা নেমেছে ১৫ কোটিতে

সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসায়ও বড় ধরনের সংকোচন হয়েছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা ছিল ৬৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে মাত্র ১৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ছয় বছরে ব্যবসা কমেছে ৫০ কোটি টাকা।

এ সময়ে জীবন তহবিলও ১৩৮ কোটি টাকা থেকে কমে ৮৮ কোটি টাকায় নেমেছে।

হোমল্যান্ড লাইফে ব্যবসায় ভয়াবহ পতন

হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় ধরনের ধসের চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা ছিল ১০১ কোটি টাকা। ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালে তা মাত্র ৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ছয় বছরে ব্যবসা কমেছে ৯২ কোটি টাকা।

একই সময়ে কোম্পানিটির জীবন তহবিলও ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০২০ সালে ২৬১ কোটি টাকা থাকা জীবন তহবিল ২০২৫ সালে কমে ১৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

গোল্ডেন লাইফের ব্যবসা কমেছে

গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০২০ সালের ব্যবসা ছিল ২৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি টাকায়।

অন্যদিকে, কোম্পানিটির জীবন তহবিল ২০২০ সালে ২৬১ কোটি টাকা ছিল। সেখান থেকে কমে ২০২৫ সালে ১৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

পদ্মা লাইফের জীবন তহবিল ঋণাত্মক

পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা ছিল ৪৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে ১৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

জীবন তহবিলের পরিস্থিতি আরও খারাপ। ২০২০ সালে কোম্পানিটির জীবন তহবিল ছিল ১৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে ঋণাত্মক ৩০৯ কোটি টাকায় নেমেছে। ফলে কোম্পানিটির টিকে থাকা নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ছোট ও নতুন কোম্পানিগুলোতেও সংকট

বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসা ২০২০ সালে ছিল ৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে ২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির জীবন তহবিল ৬৬ কোটি টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক ৬৫ কোটি টাকায় নেমেছে।

সান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসা ২০২০ সালের ১০৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২৫ সালে ১৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির জীবন তহবিল ১৮২ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ৪৯ কোটি টাকা।

প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসাও ৪২ কোটি টাকা থেকে কমে ৩০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। কোম্পানিটির জীবন তহবিল ২০২০ সালের ২৭৩ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২৫ সালে ৬৯ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ ছয় বছরে জীবন তহবিল কমেছে ২০৪ কোটি টাকা।

নতুন প্রজন্মের জীবন বিমা কোম্পানি প্রটেকটিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসা ২০২০ সালে ছিল ৩৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ কোটি টাকায়। আর জীবন তহবিল ১০ কোটি টাকা থেকে কমে মাত্র ১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কোম্পানিটির পক্ষে গ্রাহকদের বিমা দাবির অর্থ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ব্যবসার সঙ্গে জীবন তহবিল ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ

ব্যবসার পাশাপাশি জীবন তহবিল কমে যাওয়া জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। কারণ একটি বিমা প্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু নতুন ব্যবসা অর্জনই গুরুত্বপূর্ণ নয়, জীবন তহবিল ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জীবন তহবিলের সঙ্গে পলিসিধারীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ এবং কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা সরাসরি সম্পর্কিত।

কিছু কোম্পানিতে উল্টো চিত্র

তবে দেশের পুরো জীবন বিমা খাতই সংকটে রয়েছে—এমন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে ন্যাশনাল লাইফ, ডেল্টা লাইফ, জীবন বীমা করপোরেশন, প্রগতি লাইফ, সোনালী লাইফ, গার্ডিয়ান লাইফসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসা ২০২০ সালে ছিল ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।

ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবসা ৭৩২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৯ কোটি টাকা হয়েছে। জীবন বীমা করপোরেশনের ব্যবসা ৬০১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯৭৬ কোটি টাকা হয়েছে। একইভাবে প্রগতি লাইফের ব্যবসা ৩১৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬৬৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

এছাড়া মেটলাইফের ব্যবসা ২ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, সন্ধানী লাইফের ১৮৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৪৭ কোটি টাকা, সোনালী লাইফের ১৩৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮৬৬ কোটি টাকা, গার্ডিয়ান লাইফের ২৮৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮৮৬ কোটি টাকা এবং জেনিথ লাইফের ব্যবসা ১৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৭ কোটি টাকা হয়েছে।

‘ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড কমলে বুঝতে হবে ক্যানসারে আক্রান্ত’

এ বিষয়ে প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম গণমাধ্যমকে বলেন, “জীবন বিমা কোম্পানির ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড ধারাবাহিকভাবে বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। সেখানে যদি ধারাবাহিকভাবে কোনো কোম্পানির ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড কমতে থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে ওই কোম্পানিগুলো ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে।”

তিনি বলেন, “ব্যবসা কমার অর্থ কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না এবং গ্রাহকরা কোম্পানিগুলোর ওপর আস্থা পাচ্ছেন না। এটার কারণ হতে পারে কোম্পানিগুলো গ্রাহকের বিমা দাবি সঠিকভাবে দিচ্ছে না। সঠিকভাবে দাবি পরিশোধ করলে গ্রাহকদের আস্থা হারানোর কথা নয়। ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড কমলে কোম্পানিগুলোর দাবি পরিশোধের সক্ষমতা সামনে আরও কমে যাবে।”

সমস্যাগুলো একদিনে তৈরি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম হতে পারে। এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা প্রকাশ্যে আসছে। ক্যানসার আক্রান্ত এই কোম্পানিগুলোর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগে, দাবি পরিশোধে নাকি অন্য কোনো জায়গায় সমস্যা আছে, তা খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কোম্পানিগুলোকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।”

কোম্পানিগুলোর ব্যবসা কমার পেছনে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভূমিকা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে যদি ব্যবসা কমত, তাহলে সব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাতেই এর প্রভাব দেখা যেত। কিন্তু কিছু কোম্পানির ব্যবসা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তাই যেসব কোম্পানি ব্যবসা পাচ্ছে না, সেটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নয়; বরং তাদের নিজস্ব সমস্যার কারণে ব্যবসা পাচ্ছে না।

অতিরিক্ত ব্যয়ের দায়েও সংকটে জীবন বিমা কোম্পানি

মেঘনা লাইফের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুরুর দিকে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর প্রতি সরকার, মালিকপক্ষ কিংবা ব্যবস্থাপনা—কোনো পক্ষই যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।”

তিনি বলেন, “জীবন বিমা ব্যবসার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো গ্রাহকের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হয়, তার বড় অংশ ১০, ১২ কিংবা ১৫ বছর পর পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে অনেক কোম্পানি শুরুতে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার পর ভবিষ্যতের দায়ের কথা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। কোম্পানি শুরু হওয়ার পরই অনেকে অফিস-দালান করেছে, গাড়ি কিনেছে, নানা খাতে খরচ করেছে। কেউ ২০-২৫টি গাড়ি কিনেছে, কেউ ৪০০-৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প করেছে। কিন্তু যখন পলিসির টাকা পরিশোধের সময় এসেছে, তখন দেখা গেছে প্রয়োজনীয় অর্থ নেই।”

তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের অনিয়ম ও অপরিকল্পিত ব্যয়ের কারণে অনেক জীবন বিমা কোম্পানি এখন আর্থিক চাপে পড়েছে। গত ১৫ বছরেও জীবন বিমা খাতের এসব বিষয়ে যথাযথ নজরদারি ছিল না। এমনকি রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।”

মেঘনা লাইফের ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নিজাম উদ্দিন বলেন, “ব্যবসা কমার পেছনে শুধু কোম্পানির দুর্বলতা দায়ী নয়, বরং অতীতে প্রচলিত কিছু অনিয়মিত ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়াও এর অন্যতম কারণ। আগে কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থা ছিল না। এখন হিসাব-নিকাশসহ বিভিন্ন কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর ও নিয়মতান্ত্রিক হওয়ায় অতীতে যেসব অননুমোদিত বা অনিয়মিত ব্যবসা হতো, সেগুলো অনেকটাই বন্ধ হয়েছে।”

তিনি বলেন, “মেঘনা লাইফের প্রায় ৪শ থেকে ৫শ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ আটকে আছে। ব্যাংকে আটকে থাকার কারণে প্রয়োজনের সময় এই অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এছাড়া বিভিন্ন লিজিং কোম্পানিতেও অর্থ আটকে রয়েছে। তুলনামূলক বেশি মুনাফার আশায় কিছু অর্থ লিজিং কোম্পানিতে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীসময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে সেই অর্থও আটকে গেছে।”

জীবন তহবিল কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “জীবন তহবিল মূলত পলিসি হোল্ডারদের অর্থ। নতুন ব্যবসা ও রিনিউয়াল কমে গেলেও গ্রাহকদের পুরোনো পলিসির টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে জীবন তহবিল থেকে অর্থ বের হয়ে গেছে এবং তহবিল কমেছে।”

নিজাম উদ্দিন দাবি করেন, “মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করছে। তবে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অর্থ আটকে থাকায় কোম্পানিকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।”

অতীতের লুটপাটের প্রভাব এখনো রয়েছে: প্রাইম ইসলামী লাইফ

প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আকতার ব্যবসা ও জীবন তহবিল কমে যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, “দেশের পরিস্থিতি ভালো না, মানুষ বিমা করতে চায় না। আমাদের ব্যবসা কমার কারণ আগে যারা ছিল তারা লুটপাট করে চলে গেছে। আমরা এখন গ্রাহকদের টাকা ঠিকমতো দিতে পারছি না। আগে যে লুটপাট হয়েছে, তার ফল এখন আমরা ভোগ করছি। ৮০০-৯০০ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে।”

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে