×
ঢাকা, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাত্র ১ পয়সা ডিভিডেন্ড, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৬ ১৯:১০:৪৭
মাত্র ১ পয়সা ডিভিডেন্ড, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: একদিকে বাড়ছে লোকসান ও নগদ অর্থের সংকট, অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে মাত্র ১ পয়সা ক্যাশ ডিভিডেন্ড। এভাবেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য আমরা নেটওয়ার্কস লিমিটেড সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য শেয়ারপ্রতি এক পয়সা ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। কোম্পানিটির এমন নামমাত্র ডিভিডেন্ড ঘোষণা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এটিকে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সঙ্গে কার্যত প্রতারণার সামিল বলেও মনে করছেন।

৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় চূড়ান্ত করা আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, কোম্পানিটির ৬ কোটি ২২ লাখ শেয়ারের বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মোট ডিভিডেন্ডের পরিমাণ দাঁড়াবে মাত্র ৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। কোম্পানিটির সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ডিভিডেন্ড বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত নগণ্য।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা তাদের হাতে থাকা ৩ কোটি ৭ লাখ শেয়ারের বিপরীতে কোনো ডিভিডেন্ড নেবেন না। কোম্পানির তারল্য বা নগদ অর্থ ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের এই ডিভিডেন্ড না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বলে জানা গেছে।

তবে নামমাত্র এই ডিভিডেন্ড ঘোষণার পেছনে কোম্পানিটির দুর্বল আর্থিক অবস্থাই বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমরা নেটওয়ার্কসের আয় ৯৪ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে কোম্পানিটি ক্রমবর্ধমান নগদ অর্থের সংকটে পড়ে। এরই মধ্যে দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে শেয়ারবাজারে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস কমে মাত্র ০ দশমিক ১৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর আগের বছর ইপিএস ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শুধু ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন—চতুর্থ প্রান্তিকেই কোম্পানিটি ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা নিট লোকসান করেছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির আয় ২২ শতাংশ কমে ৫৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ৪ কোটি ১২ লাখ টাকা।

কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্রি কমে যাওয়া এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণেই আয়ে এমন বড় ধস নেমেছে। তবে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র আরও গভীর সংকটের কথা জানিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমরা নেটওয়ার্কসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, করপোরেট গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা অর্থ আদায় না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি তীব্র তহবিল সংকটে পড়েছে।

আমরা নেটওয়ার্কস মূলত বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করে। এসব গ্রাহক সেবা গ্রহণের পর সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করায় কোম্পানির নগদ প্রবাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কোম্পানিটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহেও।

২০২৬ সালের মার্চ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক শুন্য দশমিক ৫৫ টাকা ছিল। অর্থাৎ হিসাবের খাতায় আয় বা মুনাফা দেখালেও বাস্তবে নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

এ অবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মাত্র ১ পয়সা ডিভিডেন্ড ঘোষণা বিষয়টিকে আরও আলোচনায় এনেছে। এত কম ডিভিডেন্ড ঘোষণায় বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত অর্থে কতটা উপকৃত হবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে একসময় পুঁজিবাজারে সক্রিয় থাকা একটি কোম্পানির কাছ থেকে এমন নামমাত্র ডিভিডেন্ড প্রত্যাশার সঙ্গে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে।

নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দিক থেকেও ১ পয়সার এই ডিভিডেন্ডের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে যেতে পারে। আর ১০ শতাংশ বা তার বেশি ডিভিডেন্ড দিতে পারলে ‘এ’ ক্যাটাগরির জন্য যোগ্যতা অর্জন করে।

আমরা নেটওয়ার্কসের জন্য ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে বের হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন বিধিমালা অনুযায়ী ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ার মার্জিন ঋণ সুবিধার আওতায় আসতে পারে।

এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা নেটওয়ার্কসকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য পূর্বে অনুমোদিত ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড বিতরণে ব্যর্থ হওয়ার পর কোম্পানিটির বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

তবে এবার ১ পয়সা ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ফেরার পথ সহজ নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোম্পানিটি বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম করতে পারেনি। ফলে পরবর্তী এজিএম আয়োজনের তারিখ নির্ধারণের জন্য মাননীয় হাইকোর্টের সম্মতির প্রয়োজন হবে। ঘোষিত ১ পয়সা ডিভিডেন্ডের রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ সেপ্টেম্বর।

শেয়ারবাজারে আমরা নেটওয়ার্কসের অতীতেও বড় ধরনের মূলধন সংগ্রহের নজির রয়েছে। ২০১৭ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি ৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ২০২৪ সালে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে আরও ৯৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়।

এত বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহের পরও সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটির কার্যক্রম ও আর্থিক অবস্থায় দুর্বলতা দেখা দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে নগদ অর্থের সংকট, অন্যদিকে করপোরেট গ্রাহকদের কাছে পাওনা আদায়ে সমস্যা এবং ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মাত্র ১ পয়সা ডিভিডেন্ড ঘোষণা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আমরা নেটওয়ার্কসের শেয়ারদর সামান্য বেড়ে ১৯ টাকা ৮০ পয়সায় লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কোম্পানিটির কাগুজে মুনাফা এবং প্রকৃত নগদ অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সতর্কসংকেত।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে