ঢাকা, রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

আদনানের জেনেক্স শেয়ার বিক্রি-হস্তান্তরে বিএসইসির নিষেধাজ্ঞা

২০২৬ আগস্ট ১৬ ১৬:২২:৩১
আদনানের জেনেক্স শেয়ার বিক্রি-হস্তান্তরে বিএসইসির নিষেধাজ্ঞা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ১৬টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট গড়ে তোলার অনুসন্ধানের মধ্যে এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আদনান ইমামের নিয়ন্ত্রিত জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

বিএফআইইউ সম্প্রতি আদনান ইমামের নিয়ন্ত্রিত শেয়ার হস্তান্তর ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যবস্থা নিতে বিএসইসির কাছে একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন পাঠায়। ওই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিএসইসির নির্দেশনায় সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) আদনান ইমামের দুটি বিও হিসাবের ডেবিট লেনদেন স্থগিত করেছে।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, আদনান ইমামের বিষয়ে বিএফআইইউর পাঠানো অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও সুপারিশ পর্যালোচনা করে কমিশন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিও হিসাব থেকে জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি ও হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১২ আগস্ট ‘পাচারের অর্থে যুক্তরাজ্যে ১৬ বাড়ি!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আগামীর সময়। ওই প্রতিবেদনে আদনান ইমামের বিরুদ্ধে বিএফআইইউর অনুসন্ধানে উঠে আসা বিভিন্ন অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

বিএসইসির নির্দেশনার পর সিডিবিএল আদনান ইমামের সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবগুলোর ডেবিট লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে এসব হিসাব থেকে জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি কিংবা অন্য কোনো হিসাবে স্থানান্তরের সুযোগ থাকছে না।

সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই বিএসইসির কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠায় বিএফআইইউ। পরে ৪ আগস্ট বিএফআইইউর অনুরোধের ভিত্তিতে সিডিবিএলকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয় বিএসইসি। এর পরই আদনানের সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবগুলোর লেনদেন স্থগিত করা হয়।

জানা গেছে, ডিএসএফএম সিকিউরিটিজের বিও-১২০২৯৮০০৩৭১০৩৫৫১ এবং সিটি ব্রোকারেজের বিও-১২০৪৫০০০৩৭১০৩৫৫১ নম্বরের সক্রিয় লিংক বিও হিসাবে আদনান ইমামের জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার রয়েছে। এ দুটি হিসাবের লেনদেনেই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া আদনান ইমামের প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ ও লংকাবাংলা সিকিউরিটিজেও বিও হিসাব রয়েছে। তার মোট চারটি বিও আইডির মধ্যে তিনটি বর্তমানে সক্রিয়। অন্য একটি হিসাব আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সক্রিয় চারটি হিসাবের মধ্যে দুটি হিসাবে জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার থাকায় সেগুলোর ডেবিট লেনদেন বন্ধ রাখা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ১৬ সম্পদের সন্ধান

বিএফআইইউর অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে আদনান ইমামের নামে ১৬টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থের মাধ্যমে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আদনানের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিসের নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে নেওয়া ৩১৫ কোটি টাকা ভিন্ন খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ইউসিবির সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান রনির সঙ্গে আদনানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, পারস্পরিক যোগসাজশে বিদেশে অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে জেনেক্স ইনফোসিসের অনুকূলে ইউসিবি থেকে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, জেনেক্স ইনফোসিসকে ইউসিবি থেকে ৩১৫ কোটি ২০ লাখ টাকার ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছিল। তবে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, নগদপ্রবাহ, ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা, জামানতের পর্যাপ্ততা এবং ঋণের অর্থের ব্যবহার যথাযথভাবে তদারকি করা হয়নি বলে বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঋণের অর্থ ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর, পুরোনো ঋণ সমন্বয় এবং পুনঃতফসিলের ডাউনপেমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও গোপন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের সন্দেহ

২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের লেনদেন পর্যালোচনা করে বিএফআইইউ এ অনুসন্ধান চালায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে জেনেক্স ইনফোসিসের অনুকূলে ইস্যু করা অধিকাংশ এলসি পরবর্তী সময়ে ফোর্স লোন, টার্ম লোন ও টাইম লোনে রূপান্তর করে সমন্বয় দেখানো হয়েছে।

তবে আমদানি করা পণ্য ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হয়নি এবং পণ্য বিক্রির অর্থও ব্যাংকে ফেরত আসেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিএফআইইউ।

এ ছাড়া ওয়ার্ক অর্ডার ফাইন্যান্সের আওতায় জেনেক্স ইনফোসিসকে দেওয়া ২৯ কোটি টাকার কার্যাদেশ সম্পন্ন হওয়ার পরও সেই অর্থ ব্যাংকে ফেরত না আসাকে সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ১ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ী এবং মন্দমানের খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আদনান ইমাম পলাতক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ইংল্যান্ডের নাগরিক এবং তার পাসপোর্ট নম্বর ১২৪৩৩৮-৩৯৭।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে