ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

লোকসানের চাপে আইসিবি, প্রথমবার সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন

২০২৬ আগস্ট ১০ ২০:৫৪:০০
লোকসানের চাপে আইসিবি, প্রথমবার সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক: আর্থিক সংকট ও ক্রমবর্ধমান লোকসানের মধ্যে এবার নিজেদের ১৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে প্রথমবারের মতো সিকিউরিটিজ মূল্যায়ন নীতিমালা চালু করেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।

নতুন এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো আইসিবির সম্পদের মূল্যায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং কোনো সম্পদের মূল্য অতিরিক্ত বা কম দেখানোর ঝুঁকি কমানো। বিশেষ করে তালিকাভুক্ত নয়—এমন সিকিউরিটিজে আইসিবির বড় বিনিয়োগ রয়েছে, যেগুলোর ন্যায্য মূল্য এতদিন নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।

আইসিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে গুরুতর আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এর আগে কখনো করা হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিল্পায়ন ও শেয়ারবাজারের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে আইসিবি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মূলধন সংকটে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আন্ডাররাইটিং, ব্রিজ ঋণ এবং ইক্যুইটির বিপরীতে অর্থায়নের মাধ্যমে সহায়তা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

পরবর্তী সময়ে আইসিবির বিনিয়োগ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। প্রি-আইপিও প্লেসমেন্ট, ডিবেঞ্চার, ইক্যুইটি অংশীদারিত্ব, বন্ড ও লিজিংয়ের পাশাপাশি সেকেন্ডারি মার্কেটেও পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয়—উভয় ধরনের সম্পদে বড় বিনিয়োগ থাকলেও এতদিন ন্যায্য বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য আইসিবির কোনো মানসম্মত নীতিমালা ছিল না। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য বেশি বা কম দেখানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান ১৩ অনুযায়ী, ন্যায্য মূল্য হলো কোনো সম্পদ বিক্রি করলে বাজারের অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে যে মূল্য পাওয়া যেত, অথবা কোনো দায় হস্তান্তরের জন্য যে মূল্য পরিশোধ করতে হতো—পরিমাপের তারিখে সেই মূল্য। অর্থাৎ বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি মূলত কোনো সম্পদের সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য।

আইসিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট বিনিয়োগ পোর্টফোলিও ছিল ১৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৬৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা সরকারি সিকিউরিটিজে এবং ১৪ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা অন্যান্য বাজারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ করা ছিল।

মোট বিনিয়োগের মধ্যে তালিকাভুক্ত নয় এমন সিকিউরিটিজে আইসিবির এক্সপোজার প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মিউচুয়াল ফান্ডে ৮৯৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, প্রেফারেন্স শেয়ারে ১৪৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সাধারণ শেয়ারে ৫৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে।

এদিকে বিনিয়োগে দুর্বল সিদ্ধান্ত, বাজারের অস্থিরতায় পোর্টফোলিওর বড় ধরনের অবমূল্যায়ন এবং শেয়ারবাজারকে সহায়তা করতে গিয়ে নেওয়া বিপুল ঋণের বোঝায় বর্তমানে গুরুতর সংকটে রয়েছে আইসিবি। একসময় লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি এখন আর্থিক চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারি সার্বভৌম গ্যারান্টির বিপরীতে নেওয়া ঋণের মেয়াদ শেষ হলেও আইসিবি তা পরিশোধ করতে পারেনি। পরে সরকার ঋণ পরিশোধের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া ঋণের সুদও পরিশোধ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

পুঁজিবাজারকে দীর্ঘদিন সহায়তা করতে গিয়ে সরকার, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে আইসিবি। এতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে এবং নতুন করে সরকারের সহায়তা চাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিবি ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। এর ফলে ওই বছর প্রতিষ্ঠানটি কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। চলতি অর্থবছরেও লোকসানের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আরও ৫৮৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এতে আইসিবির সঞ্চিত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা।

আইসিবির ওই কর্মকর্তা বলেন, দেশের শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে বহু বছর ধরে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে আইসিবি। এ সময় তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয়—উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে অনেক তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হলেও সেগুলোর ন্যায্য মূল্য কখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ আইসিবিকে পুনর্গঠন ও সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সম্পদের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ সেই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নতুন নীতিমালাটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। এতে তালিকাভুক্ত ইক্যুইটি, ডিবেঞ্চার, বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের পাশাপাশি প্রেফারেন্স শেয়ার, আন্ডাররাইটিং সিকিউরিটিজ এবং তালিকাভুক্ত নয় এমন ফান্ডের মূল্য নির্ধারণের জন্য পৃথক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।

নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য আইসিবি সাত সদস্যের একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করেছে। নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুযায়ী কমিটিটি বিনিয়োগের সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারণ করবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর সরাসরি পরিচালনা পর্ষদের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে।

তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন তারিখে স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হওয়া সর্বশেষ সমাপনী দরকে ন্যায্য মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কোনো তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে টানা ছয় মাস লেনদেন না হলে সেটির মূল্য তালিকাভুক্ত নয় এমন সিকিউরিটিজের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হবে।

তালিকাভুক্ত নয়, তালিকাচ্যুত অথবা গত ছয় মাসে কোনো লেনদেন হয়নি—এমন সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিট সম্পদ মূল্য বা এনএভি পদ্ধতি ব্যবহার করে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করবে মূল্যায়ন কমিটি।

অন্যদিকে বন্ড, ডিবেঞ্চার ও প্রেফারেন্স শেয়ারের মতো নির্দিষ্ট আয়ের বিনিয়োগ থেকে নির্ধারিত মূলধন, সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া না গেলে ধাপে ধাপে মূল্য কমানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে নতুন নীতিমালায়।

নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব বিনিয়োগ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় হচ্ছে, সেগুলো ক্রয়মূল্যেই ন্যায্য মূল্য হিসেবে বহাল থাকবে। তবে এক বছর ধরে পাওনা অর্থ আদায় না হলে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের মূল্য ক্রয়মূল্যের ৭৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। দুই বছর পর তা কমে হবে ৫০ শতাংশ। আর তিন বছরের বেশি সময় খেলাপি থাকলে সম্পূর্ণ মূল্য শূন্য হিসেবে দেখানো হবে।

এ ছাড়া তালিকাভুক্ত নয় এমন সিকিউরিটিজ থেকে আদায় না হওয়া সুদ বা ডিভিডেন্ড কোনোভাবেই হিসাবভুক্ত আয় হিসেবে দেখানো যাবে না। প্রকৃতপক্ষে অর্থ হাতে না আসা পর্যন্ত এসব আয় হিসাবের খাতায় যুক্ত করা যাবে না—এমন কঠোর নির্দেশনাও রাখা হয়েছে নতুন মূল্যায়ন নীতিমালায়।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে