ঢাকা, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

প্রেমিকার গ্রিন কার্ড নিশ্চিত করতে যা করেছিলেন এপস্টেইন

২০২৬ জুলাই ২৭ ১৩:১৯:২৬
প্রেমিকার গ্রিন কার্ড নিশ্চিত করতে যা করেছিলেন এপস্টেইন

নিজস্ব প্রতিবেদক: মার্কিন ধনকুবের ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ডা. কারিনা শুলিয়াককে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে রাখার জন্য দুই নারীর মধ্যে সাজানো বিয়ের আয়োজন করেছিলেন বলে নতুন প্রকাশিত নথিতে উঠে এসেছে। এপস্টেইনের নির্দেশে তার এক নারী সহকারীকে শুলিয়াকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। পরে ওই বিয়ের সূত্রে শুলিয়াক যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পান এবং ২০১৮ সালে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন।

সম্প্রতি প্রকাশিত এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি ও ই-মেইল থেকে তার সঙ্গে শুলিয়াকের দীর্ঘ সম্পর্কের নানা তথ্য সামনে এসেছে। প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, বেলারুশের নাগরিক শুলিয়াক ছিলেন এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তিদের একজন। তাদের সম্পর্কের শুরু ২০১১ সালে নিউইয়র্কে। প্রায় আট বছর ধরে তারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ছিলেন।

শুলিয়াক ২০১২ সালে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ডেন্টাল মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন। সে সময় তার শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ২০১৩ সালের শুরুতে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে রাখার উপায় খুঁজতে শুরু করেন এপস্টেইন। নথি অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত দুই নারীর মধ্যে বিয়ের পরিকল্পনা করেন তিনি, যাতে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম নজর কাড়ে।

ই-মেইল থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এপস্টেইন তার এক নারী সহকারীকে নিউইয়র্ক সিটির ম্যারেজ ব্যুরোতে যাওয়ার নির্দেশ দেন। প্রায় তিন সপ্তাহ পর ওই নারী ও শুলিয়াক আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। পরে এপস্টেইনের নিয়োগ করা এক অভিবাসন আইনজীবী শুলিয়াককে ওই নারীর বৈধ স্ত্রী হিসেবে দেখিয়ে গ্রিন কার্ডের আবেদন করেন। আবেদনটি অনুমোদিত হলে শুলিয়াকের বিরুদ্ধে বহিষ্কার-সংক্রান্ত কার্যক্রম বাতিল হয় এবং কয়েক মাস পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান।

২০১৮ সালে শুলিয়াক মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। এক বছর পর ওই বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটে। তবে পরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এপস্টেইনের ওই নারী সহকারীকে জোর করে বিয়েতে বাধ্য করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, শুলিয়াকের বহিষ্কার শুনানির মাত্র কয়েক দিন আগে বিয়েটি পরিকল্পনা করা হলেও এ বিষয়ে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনা অনুযায়ী, কারিনা শুলিয়াক এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ব্যতিক্রমী অবস্থানে ছিলেন। তিনি নিজেকে এপস্টেইনের যৌন নির্যাতনের শিকার হিসেবে দাবি করেননি। একই সঙ্গে ফেডারেল কর্তৃপক্ষও তাকে এপস্টেইনের যৌন পাচার চক্রের সহঅভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করেনি।

তবে প্রকাশিত ই-মেইল ও নথিতে তাদের সম্পর্কের মধ্যে অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও এপস্টেইনের প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এপস্টেইন শুলিয়াককে নিজের ‘প্রিয়তমা’ বলে সম্বোধন করতেন। শুলিয়াক তার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতেন, এপস্টেইনের অর্থে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন এবং কয়েক বছর ধরে তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এপস্টেইন শুলিয়াকের বাবা-মায়ের কাছেও অর্থ পাঠিয়েছিলেন।

সময় গড়ানোর সঙ্গে শুলিয়াক এপস্টেইনের বিভিন্ন বাড়ি ও কর্মচারীদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নিতে শুরু করেন। এমনকি ২০১৯ সালে এপস্টেইন গ্রেপ্তারের কয়েক সপ্তাহ আগে মরক্কোয় একটি প্রাসাদ কেনার প্রচেষ্টাতেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন বলে নথিতে উঠে এসেছে।

২০১১ সালের মার্চের শেষ দিকে নিউইয়র্কে এপস্টেইনের সঙ্গে শুলিয়াকের পরিচয় হয়। সে সময় বেলারুশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা শুলিয়াকের বয়স ছিল ২০-এর কোঠায়। তিনি ইংরেজি শেখার পাশাপাশি ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং নিজের দন্তচিকিৎসা শিক্ষাজীবন শেষ করার পথ খুঁজছিলেন।

শৈশব থেকেই দন্তচিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল শুলিয়াকের। বেলারুশের মিনস্কে পাঁচ বছরের দন্তচিকিৎসা কোর্সের চার বছর শেষ করেছিলেন তিনি। ২০১২ সালে এপস্টেইনের সহায়তা নিতে রাজি হন শুলিয়াক।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ডেন্টাল মেডিসিন বিভাগ প্রথমে তাকে ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে এপস্টেইন তার নিজের দন্তচিকিৎসকের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে বড় অঙ্কের অনুদানের প্রস্তাব দেন। শেষ পর্যন্ত নথি অনুযায়ী, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ডলার অনুদান দেন। প্রকাশিত বিচার বিভাগের নথিতে এমন বার্তাও রয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুলিয়াককে ভর্তি পরীক্ষার কিছু প্রশ্ন আগেভাগে জানিয়ে দেওয়ার অভিযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ভর্তি হওয়ার পর এপস্টেইন শুলিয়াকের মাকে বেলারুশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন এবং পরবর্তী তিন বছরের টিউশন ফিও পরিশোধ করেন। এর বিনিময়ে শুলিয়াক এক বার্তায় এপস্টেইনকে ‘অসাধারণ মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করে তার সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তবে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েনও ছিল। এপস্টেইনের অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে শুলিয়াক আপত্তি জানিয়েছিলেন। এক বার্তায় তিনি জানান, বিষয়টি তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় না। এরপরও তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে থাকার কথা জানান।

এপস্টেইনের সম্পত্তির নথিতে ৩৩ ক্যারেটের একটি মূল্যবান হীরার আংটির উল্লেখ রয়েছে। হাতে লেখা একটি নোটে বলা হয়েছে, আংটিটি দেওয়া হয়েছিল ‘বিয়ের উদ্দেশ্যে’। আংটির প্রাপক ছিলেন কারিনা শুলিয়াক।

২০১৯ সালে কারাগারে মৃত্যুর আগে এপস্টেইন শেষবার ফোনে যাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাদের মধ্যে শুলিয়াক অন্যতম ছিলেন। এপস্টেইনের উইল অনুযায়ী, শুলিয়াক সর্বোচ্চ ১০ কোটি ডলার এবং ওই হীরার আংটির উত্তরাধিকারী হতে পারেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য দায় পরিশোধের পর তার সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য অনেক কমে গেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত শুলিয়াক ঠিক কত অর্থ উত্তরাধিকার হিসেবে পাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০১৯ সালের শুরুতেও শুলিয়াক এপস্টেইনের নিউইয়র্কের বাড়িতে বেশিরভাগ সময় থাকতেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দন্তচিকিৎসার লাইসেন্স অর্জন করেন এবং ২০১৫ সালে পড়াশোনা শেষ করেন। তবে নিজের পেশাগত কাজের পাশাপাশি এপস্টেইনের বিভিন্ন বাড়ির সাজসজ্জা, আসবাবপত্র কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও তিনি দায়িত্ব পালন করতেন।

২০১৯ সালের জুনে তারা একসঙ্গে প্যারিসে যান। পরে এপস্টেইন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এলেও শুলিয়াক ইউরোপে থেকে যান। ৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর এপস্টেইনকে ফেডারেল কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার করেন।

গ্রেপ্তারের প্রায় এক মাস পর কারাগার থেকে শুলিয়াকের সঙ্গে প্রায় ২০ মিনিট ফোনে কথা বলেন এপস্টেইন। মামলাটি নিষ্পত্তি হতে সময় লাগতে পারে জানিয়ে তাকে আপাতত অন্য কোথাও থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

এর পরদিন, ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট, কারাগারের কক্ষে এপস্টেইনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে নিজের উইল সংশোধন করে এপস্টেইন তার সম্পদের একটি বড় অংশ শুলিয়াকের নামে রেখে যান। সেই সম্পদের মধ্যে ৩৩ ক্যারেটের হীরার আংটিও ছিল। তবে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন দায় পরিশোধের পর তার সম্পদের প্রকৃত মূল্য কত দাঁড়াবে এবং শুলিয়াক শেষ পর্যন্ত কতটা উত্তরাধিকার পাবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এপস্টেইনের মৃত্যুর কয়েক বছর পর প্রকাশিত বিপুল নথি ও ই-মেইলের মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক এবং আর্থিক কর্মকাণ্ডের আরও অনেক অজানা তথ্য সামনে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় কারিনা শুলিয়াকের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং গ্রিন কার্ড পাইয়ে দিতে সাজানো বিয়ের আয়োজনের বিষয়টিও এখন আলোচনায় এসেছে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে