ঢাকা, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যবসায় নতুন নিয়ম

২০২৬ জুলাই ২৭ ১১:২১:৩৩
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যবসায় নতুন নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক: ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন ছাড়া বাংলাদেশে নতুন করে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না গুগল, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফরম বা প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে কোনো বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে চাইলে তাদেরও বাধ্যতামূলকভাবে ডিবিআইডি নিবন্ধন নিতে হবে।

এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানকে দেশের প্রচলিত ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। এমন বিধান রেখে ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’-এর পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়ার ওপর আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও সাধারণ মানুষের সুনির্দিষ্ট মতামত আহ্বান করা হয়েছে। মতামত পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত খসড়া আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এ খাতে নির্দিষ্ট ও সমন্বিত নীতিমালা না থাকায় সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ কারণে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনা করেই এটি চূড়ান্ত করা হবে।

ডিবিআইডি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য পরিচালনার আগে বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানকে ডিবিআইডি নিবন্ধন নিতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইনে খুচরা বিক্রি বা যেকোনো ধরনের ডিজিটাল বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হবে।

নিবন্ধনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেশের প্রচলিত ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য করসংক্রান্ত আইনও মেনে চলতে হবে।

নীতিমালাটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে মেটা, গুগল, ইউটিউবসহ অন্যান্য বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফরম প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ছাড়া বাংলাদেশে নতুন কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না। তবে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন নেওয়ার পর দেশের প্রচলিত আইন মেনে বৈধভাবে আমদানি করা পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন অনলাইন প্ল্যাটফরমে প্রচার করা যাবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি প্ল্যাটফরমে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা ও বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে।

রপ্তানিতে সহায়তার প্রস্তাব

খসড়া নীতিমালায় দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (এমএসএমই) উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল মাধ্যমে বিশ্ববাজারে রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ নীতিসহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পার্সেলভিত্তিক রপ্তানির পূর্ণ সুবিধা ও উপযুক্ত বীমাব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে।

ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অর্জিত আন্তর্জাতিক রপ্তানি আয়কে প্রচলিত রপ্তানির মতো স্বীকৃতি দিয়ে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিষয় বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ও বিদেশে দ্রুত প্রসেসিং সেন্টার এবং বিশ্বমানের গুদামজাতকরণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে নীতিসহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

নকল ও প্রতারণামূলক পণ্য বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা

নীতিমালায় ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে নকল, ভেজাল ও প্রতারণামূলক পণ্য বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক অনৈতিক জুয়া, লটারি, বেটিং এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি নীতিতে নিষিদ্ধ যেকোনো পণ্য বা সেবার ডিজিটাল বাণিজ্য থেকেও বিরত থাকতে হবে।

এ ছাড়া এমন কোনো চটকদার বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না, যা দেশের ডিজিটাল বাজারের স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে কিংবা ভোক্তাকে প্রতারিত বা বিভ্রান্ত করতে পারে।

আমদানি ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে নতুন উদ্যোগ

খসড়ায় ব্যবসা-টু-ব্যবসা (বি-টু-বি), ব্যবসা-টু-ভোক্তা (বি-টু-সি) এবং বি-টু-বি-টু-সি ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ডিজিটাল আমদানির সুযোগ আরও সম্প্রসারণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

অনলাইনে সরাসরি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান মূল্যসীমা যৌক্তিক পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ বা পুনর্বিবেচনার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ের প্রস্তাব রয়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য ত্রুটিপূর্ণ হলে তা ফেরত দেওয়া বা পুনরায় রপ্তানির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা লেনদেন সহজ ও নিরাপদ করতে বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর প্রযুক্তিগত সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। অনলাইন লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘ক্রস-বর্ডার এসক্রো’ সেবা চালুর কথাও বলা হয়েছে।

নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে আনা এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধ সহজ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য।

ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্ব

ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায়ও একাধিক বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিক্রয়োত্তর সেবা, পরিশোধিত অর্থ ফেরত, পণ্য ফেরত, ওয়ারেন্টি ও গ্যারান্টি সম্পর্কে কেনাকাটার আগে ক্রেতাকে স্পষ্ট ও সঠিক তথ্য দিতে হবে।

সরবরাহ করা পণ্য প্রদর্শিত বর্ণনার সঙ্গে না মিললে কিংবা ত্রুটিপূর্ণ বা নকল প্রমাণিত হলে বিক্রেতাকে তা ফেরত নিয়ে ক্রেতার সম্পূর্ণ অর্থ দ্রুত ফেরত দিতে হবে।

এ ছাড়া ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ডিজিটাল অভিযোগ ও সেবা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিকায়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ (এডিআর) ব্যবস্থা চালুর কথাও খসড়া নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশে বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের বিজ্ঞাপন, অনলাইন ব্যবসা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি হবে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর সর্বশেষ খবর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি - এর সব খবর



রে