ঢাকা, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

১১ বছরেও ভাঙল না রপ্তানির 'দেড় বিলিয়ন ডলারের দেয়াল'

২০২৬ জুলাই ১৮ ১৬:৩৭:৫১
১১ বছরেও ভাঙল না রপ্তানির 'দেড় বিলিয়ন ডলারের দেয়াল'

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানির সম্ভাবনা অনেক হলেও সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এক থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই আটকে রয়েছে। এমনকি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর হওয়ার পরও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি আসেনি; বরং গত অর্থবছরে রপ্তানি কমেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি হয়েছে ১৩৬ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। একই সঙ্গে এটি সরকারের নির্ধারিত ১৬৭ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম।

জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। গত অর্থবছরে মোট রপ্তানির ১১৬ কোটি ডলার এসেছে শুধু তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ জাপানে পোশাক আমদানির বাজারের আকার প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জাপানে সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে, যার পরিমাণ ছিল ১৪৫ কোটি ডলার। এরপর থেকে সেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হয়। এ চুক্তির আওতায় ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত সেই সুবিধার প্রতিফলন রপ্তানিতে দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেই হবে না; উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য ও বাজার কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হবে।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, কিন্তু জাপানের মতো বড় বাজারে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়নি।

তার মতে, সরকার ও রপ্তানিকারকদের সমন্বিত উদ্যোগের অভাবেই জাপানে রপ্তানি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি আরও বলেন, শুধু পোশাক নয়, জাপানের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতে হবে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, জাপানের বাজারে সফল হতে হলে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা একই ধরনের পণ্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। স্পোর্টসওয়্যারসহ জাপানি ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর জোর দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইপিএ শুধু শুল্ক সুবিধার বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগও তৈরি করে।

তিনি বলেন, নতুন চুক্তির ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সিঙ্গেল-স্টেজ ট্রান্সফরমেশন রুলস অব অরিজিন সুবিধা পাওয়া যাবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

তবে তিনি মনে করেন, শুল্কমুক্ত সুবিধার পূর্ণ সুফল পেতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ ভোক্তার জাপানি বাজারে বাংলাদেশের আরও বড় অবস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে। এজন্য সরকার ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

তাদের পরামর্শ, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জাপানে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী উৎপাদন, বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে