ঢাকা, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

রাজধানীর দিকে ধেয়ে আসছে বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা

২০২৬ জুলাই ১৭ ০৮:২১:৩৩
রাজধানীর দিকে ধেয়ে আসছে বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকায় যেকোনো সময় ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ভূতাত্ত্বিকরা। তাদের মতে, ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের ভূমিকম্পের ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা পুনরাবৃত্তির সময়সীমা প্রায় শেষ হওয়ায় এ ঝুঁকি এখন আরও প্রকট। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে বলা হয়েছে, এমন ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে ভয়াবহ প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব ঢাকার ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের পর বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্প নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই আশঙ্কার পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি ভূমিকম্পের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। এতে অনেক ভবন হেলে পড়ে, সারা দেশে ১০ জনের মৃত্যু এবং শত শত মানুষ আহত হন। এরপরও তুলনামূলক কম মাত্রার একাধিক ভূমিকম্প হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ও ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এসব ছোট কম্পন ভূগর্ভে সঞ্চিত বিশাল শক্তির ইঙ্গিত, যা বড় ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা হতে পারে।

ভূতাত্ত্বিকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট—ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। রাজধানীর কাছাকাছি মধুপুর ফল্ট এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ডাউকি ফল্ট সিস্টেমে দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের শক্তি নির্গত না হওয়ায় সেখানে বিপুল চাপ জমে আছে, যা বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে। বালু ও নরম পলিমাটি দিয়ে ভরাট এসব এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে মাটি তরলের মতো আচরণ করতে পারে। ফলে বহুতল ভবন দেবে যাওয়া বা হেলে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, ভূমিকম্পের সময় আগে থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতির বিকল্প নেই। তার মতে, এ বিষয়ে দীর্ঘদিন কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিল, যার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। বর্তমান সরকারের কাছে তার প্রত্যাশা, ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি জানান, দেশের প্রায় ২০ লাখ চার থেকে ১০ তলা ভবনের নিরাপত্তা যাচাই এখন সময়ের দাবি।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত কোনো কর্মসূচি না থাকলেও নতুন ভবন যেন মানসম্মতভাবে নির্মিত হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের রাজউক এলাকায় প্রায় ২১ লাখ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে দুর্বল কাঠামোর প্রায় ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে। এতে স্বল্প সময়েই ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে, যা পরবর্তীতে আরও বাড়তে পারে। এছাড়া চার তলার বেশি ভবনের প্রায় ৪০ শতাংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বড় মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় সাড়ে আট লাখ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল অবকাঠামো। জলাশয় ভরাট করে গড়ে ওঠা এলাকা, বিল্ডিং কোড না মেনে নির্মাণ, সরু অলিগলি, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব, গ্যাস ও স্যুয়ারেজ লাইনের ঝুঁকি এবং উদ্ধার সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা বড় ধরনের ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাদের মতে, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব না হলেও যথাযথ প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য নতুন ভবনে জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, মাটির লিকুইফ্যাকশন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের রেট্রোফিটিং, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো, ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ, ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পুরান ঢাকার সড়ক প্রশস্ত করা এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে