ঢাকা, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

কাগজে লাভ, বাস্তবে বিশাল লোকসান ওয়ান ব্যাংকের? 

২০২৬ জুন ২২ ১৭:৫৬:১৭
কাগজে লাভ, বাস্তবে বিশাল লোকসান ওয়ান ব্যাংকের? 

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠান ওয়ান ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ব্যাংকটির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান মাহামুদ সবুজ অ্যান্ড কোং, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের পার্টনার মোদাসসার আহমেদ সিদ্দিক এফসিএ ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন।

নিরীক্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে ওয়ান ব্যাংক ২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কর-পরবর্তী নিট মুনাফা, ২ হাজার ৩৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা শেয়ারহোল্ডারস’ ইকুইটি, শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ০.২০ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ২১.৯২ টাকা দেখিয়েছে। তবে ব্যাংকটি ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য বিআরপিডি সার্কুলার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ৩ হাজার ৯০৩ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রভিশন স্বীকৃতি দেয়নি।

নিরীক্ষকের মতে, এই প্রভিশন বিলম্বিত না করে যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত করা হলে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার পরিবর্তে ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ২১ লাখ টাকা লোকসানে পরিণত হতো। একই সঙ্গে শেয়ারহোল্ডারস’ ইকুইটি ২ হাজার ৩৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক ১ হাজার ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকায় নেমে আসত। এ ক্ষেত্রে ৫৪১ কোটি ১৬ লাখ টাকার ডিফার্ড ট্যাক্স অ্যাসেট সমন্বয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ইপিএস ০.২০ টাকার পরিবর্তে ঋণাত্মক ৩১.৩৪ টাকা এবং এনএভি ২১.৯২ টাকার পরিবর্তে ঋণাত্মক ৯.৬২ টাকা হতো।

ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণীর ৭.১১ নম্বর টীকায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএসডি-১ (উইং-২)/২২০৯/২০২৬-৩১২ নম্বর চিঠির মাধ্যমে ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রদত্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে ৩ হাজার ৯০৩ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রভিশন স্বীকৃতি স্থগিত রাখা হয়েছে।

নিরীক্ষক আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির ঘোষিত শেয়ারহোল্ডারস’ ইকুইটি ছিল ২ হাজার ৩৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রভিশন স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা ঋণাত্মক ১ হাজার ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকায় নেমে যেত, যা ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (১৫ জুন ২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত) অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যূনতম ৫০০ কোটি টাকার মূলধন সংরক্ষণ শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হতো। ফলে ব্যাংকটি আইনগত ন্যূনতম মূলধন প্রয়োজনীয়তারও নিচে নেমে যেত।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৫ (২৭ নভেম্বর ২০২৪) অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন সংক্রান্ত নির্দেশনার বিষয়েও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। সার্কুলারের ৬(সি)(i) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যাংকগুলো প্রয়োজনবোধে গুণগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে আরও প্রতিকূল শ্রেণিকরণ করতে পারে এবং ৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাবস্ট্যান্ডার্ড (এসএস) ও ডাউটফুল (ডিএফ) ঋণের ওপর অর্জিত সুদ আয় হিসেবে গণ্য না করে ‘ইন্টারেস্ট সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে’ স্থানান্তর করতে হয়।

কিন্তু নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ওয়ান ব্যাংক কিছু ঋণ ও অগ্রিমকে গুণগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে অশ্রেণিকৃত অবস্থায় রেখেছে, যদিও সেগুলো বাস্তব সূচকের ভিত্তিতে বিরূপ শ্রেণিকরণের যোগ্য ছিল। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ঋণের অর্জিত সুদ আয় হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা বিধি অনুযায়ী ইন্টারেস্ট সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর হওয়ার কথা ছিল।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, এ ধরনের আয় হিসেবে স্বীকৃত সুদের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, কারণ প্রয়োজনীয় তথ্য তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়নি। তবে তাদের ধারণা, এই অশ্রেণিকৃত রাখা ঋণগুলোর বিপরীতে স্বীকৃত সুদের পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। যদি ঋণগুলোকে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী শ্রেণিকরণ করা হতো, তাহলে ওই সুদ আয় হিসেবে গণ্য হতো না এবং ব্যাংকের ঘোষিত সুদ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত। একই সঙ্গে প্রভিশন সংক্রান্ত অতিরিক্ত সমন্বয়, কর এবং ডিফার্ড ট্যাক্সের প্রভাব বিবেচনায় মুনাফা ও শেয়ারহোল্ডারস’ ইকুইটির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।

এছাড়া আর্থিক বিবরণীর ১৩.৩ নম্বর টীকায় উল্লিখিত মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও) সম্পর্কেও আপত্তি তুলেছেন নিরীক্ষক। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৮ (২১ ডিসেম্বর ২০১৪) অনুযায়ী ব্যাংককে একক (Solo) ও সমন্বিত (Consolidated) উভয় ভিত্তিতেই ন্যূনতম মোট মূলধন এবং ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ১২.৫০ শতাংশ অনুপাত বজায় রাখতে হয়।

কিন্তু ওয়ান ব্যাংক ২০২৫ সালের শেষে একক ভিত্তিতে ১১.১২ শতাংশ এবং সমন্বিত ভিত্তিতে ১১.৩৩ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে রয়েছে।

সার্বিকভাবে নিরীক্ষকের ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদে উঠে আসা তথ্যগুলো থেকে ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থান, প্রভিশন ব্যবস্থাপনা, ঋণ শ্রেণিকরণ এবং মূলধন পর্যাপ্ততা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নিরীক্ষক মতামত অক্ষুণ্ন রাখলেও এসব বিষয়ের প্রতি বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অংশীজনদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে