ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

যে বাংলাদেশির হাতে ফুটে ওঠে কাবার গিলাফের কোরআনের আয়াত

২০২৬ জুন ১৮ ১০:১৫:১৬
যে বাংলাদেশির হাতে ফুটে ওঠে কাবার গিলাফের কোরআনের আয়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক: মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র স্থান কাবা শরিফকে আবৃত করে রাখা কালো রেশমি গিলাফ বা ‘কিসওয়া’ প্রতিবছর লাখো মুসল্লির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সোনা ও রুপার সুতোয় বোনা এই গিলাফে খচিত পবিত্র কোরআনের আয়াত ও নান্দনিক ক্যালিগ্রাফির পেছনে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পী মুখতার আলম শাকদার।

২০০২ সাল থেকে তিনি কাবার কিসওয়ার প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আরবি ক্যালিগ্রাফিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তাকে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে।

মুখতার আলমের পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার রশিদের ঘোনা গ্রামে। তার বাবা মফিজুর রহমান বিন ইসমাইল সিকদার। তবে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৌদি আরবে। ছোটবেলা থেকেই আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল।

মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৯২ সালে চারুকলায় স্নাতক এবং ২০০১ সালে ক্যালিগ্রাফিতে বিশেষায়িত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ক্যালিগ্রাফির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৪২২ হিজরিতে জেদ্দার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মদ সালেম বাজনাইদের সঙ্গে মুখতার আলমের পরিচয় হয়। তার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে বাজনাইদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মুখতার আলমের জীবনবৃত্তান্ত ও শিল্পকর্মের নমুনা পাঠান।

পরবর্তীতে উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৪২৩ হিজরির জমাদিউল আউয়াল মাসে (জুলাই ২০০২) মক্কার কিসওয়া কারখানার প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

কিসওয়ার ক্যালিগ্রাফিতে ব্যবহৃত ‘থুলুথ’ লিপির মূল নকশা তৈরি করেছিলেন শেখ আব্দুল রহিম আমিন বুখারী। মুখতার আলম সেই ঐতিহ্যবাহী নকশার মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে অক্ষরের পরিমাপ, নান্দনিকতা ও অনুপাতের ক্ষেত্রে আধুনিক পরিমার্জন যোগ করেন।

এ ছাড়া কাবার দরজার পর্দা ও গিলাফের অলংকারিক নকশাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি তিনি ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ ক্যালিগ্রাফি প্রোগ্রাম চালু করেন, যা কিসওয়ার নকশায় নির্ভুলতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি শিক্ষা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন মুখতার আলম। ১৯৮০ সালে মক্কার কুরআন মুখস্থকরণ সংস্থায় যুক্ত হয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর শিক্ষকতা করেন। এছাড়া মাসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে অবস্থিত দার আল-আরকাম ইনস্টিটিউটেও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০০২ ও ২০১১ সালে তিনি পবিত্র কুরআনের ওপর দুটি ‘ইজাজাহ’ (সনদ) অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি মক্কার কুরআন মুখস্থকরণ সংস্থার তত্ত্বাবধায়ক, জেদ্দার হ্যান্ডস ক্রাফট অ্যাসোসিয়েশনের আরবি ক্যালিগ্রাফি উপদেষ্টা, জেদ্দা আরবি ক্যালিগ্রাফি সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং সৌদি সায়েন্টিফিক সোসাইটি ফর অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৮৯ সালে তুরস্কে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আরবি ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় ফার্সি ক্যালিগ্রাফি বিভাগে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

সম্প্রতি বিশেষ রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখা বিদেশি পেশাজীবীদের সঙ্গে মুখতার আলমকেও সৌদি নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। এই অর্জন উপলক্ষে মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদের প্রধান ইমাম তার সম্মানে সংবর্ধনার আয়োজন করেন এবং বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।

মোহাম্মদ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

ধর্ম ও জীবন এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম ও জীবন - এর সব খবর



রে