ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬

আইপিও সংকট, উচ্চ সুদহার ও অনিশ্চয়তায় চাপে শেয়ারবাজার

২০২৬ মে ১২ ১৫:৪৩:৫৫
আইপিও সংকট, উচ্চ সুদহার ও অনিশ্চয়তায় চাপে শেয়ারবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকার মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে এখন প্রায় প্রতিদিনই একই দৃশ্য—বড় মনিটরে লাল সংকেত, কমছে সূচক, পড়ছে অধিকাংশ শেয়ারের দাম। সকালবেলায় কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও দুপুরের পর বিক্রির চাপ বাড়ছে, আর দিনশেষে হতাশ মুখে ফিরছেন বিনিয়োগকারীরা।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মিজানুর রহমান পাঁচ বছর আগে লাভের আশায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। কিন্তু দীর্ঘ দরপতনে তার বিনিয়োগ এখন নেমে এসেছে প্রায় ৩ লাখ টাকায়।

তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী সময় থেকেই বাজারে অস্থিরতা চলছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছুদিন উত্থান দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। এখন আবার ধারাবাহিক দরপতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু শেয়ারবাজারের নয়; দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদহার বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ডলারের চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন “আস্থার সংকট”। বিনিয়োগকারীরা স্থায়ী ইতিবাচক প্রবণতা দেখতে পাচ্ছেন না। ফলে সামান্য উত্থান হলেই বড় বিনিয়োগকারীরা লাভ তুলে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভালো ও বড় কোম্পানির আইপিও না আসাও বাজারে স্থবিরতার বড় কারণ। প্রায় দুই বছর ধরে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন আইপিও না আসায় বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমেছে।

মিডওয়ে সিকিউরিটিজের এমডি মো. আশিকুর রহমান বলেন, শেয়ারবাজার মূলত একটি “পণ্যের বাজার”। সেখানে যদি ভালো কোম্পানি না আসে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা কেন ঝুঁকি নেবেন?

তার মতে, বর্তমানে অনেক স্মলক্যাপ ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ছে শুধুই জল্পনার কারণে। পরে বড় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিলে বাজার আবার পড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে ব্যাংক আমানত ও ট্রেজারি বন্ডে উচ্চ সুদহারও শেয়ারবাজারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ অনেক বিনিয়োগকারী এখন ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারের বদলে নিরাপদ আমানতে ঝুঁকছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণও কমে গেছে। নতুন শিল্প বিনিয়োগ কম হলে পুঁজিবাজারেও বড় মূলধনের চাহিদা তৈরি হয় না।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রভাবও দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা চান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আস্থা এখনও তৈরি হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে টেকসই গতি ফেরাতে হলে মানসম্পন্ন ও বড় কোম্পানিকে আইপিওতে আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, কম সুদহার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন।

তাদের মতে, শুধু সূচক বাড়ালেই হবে না—বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেটিই এখন বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ওমর আলী/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে