ঢাকা, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

ফেসবুকের সেই অফারই নিয়ে গেল তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে!

২০২৬ মে ১১ ১২:২৯:৫৯
ফেসবুকের সেই অফারই নিয়ে গেল তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে!

নিজস্ব প্রতিবেদক: মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার ইলেকট্রিশিয়ান মোহন মিয়াজী ফেসবুকে দেখা একটি চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাশিয়ায় গিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রায় পাঁচ গুণ বেশি বেতনের প্রলোভনে তিনি ২০২৪ সালে আরও কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেন। উন্নত জীবনের আশায় নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তাকে ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে নিয়ে যায় বলে তিনি দাবি করেন।

প্রথম দিকে মোহন রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলের সোবোডনি এলাকায় একটি গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্টে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ পান। সেখানে তিনি কয়েক মাস কাজ করেন এবং তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। তবে কঠিন আবহাওয়া ও চরম শীতের মধ্যেও তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার ভাষায়, সেই সময় তিনি বুঝতেই পারেননি সামনে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।

কয়েক মাস পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মোহনের দাবি অনুযায়ী, তাকে জানানো হয় যে নতুন একটি প্রকল্পে কাজের জন্য রোস্তভ-অন-ডনে যেতে হবে। সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি দেখতে পান, এটি কোনো সাধারণ কাজের জায়গা নয় বরং একটি সামরিক ঘাঁটি। সেখানেই তাকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়, যেখানে অস্ত্র চালনা, গ্রেনেড নিক্ষেপসহ বিভিন্ন যুদ্ধকৌশল শেখানো হয়।

এরপর তাকে ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের আভদিভকা এলাকায় পাঠানো হয়, যা তখন যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ ফ্রন্টলাইন ছিল। সেখানে তিনি একটি লজিস্টিক ইউনিটে কাজ করতে বাধ্য হন। তার কাজ ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাবারুদ ও জ্বালানি সরবরাহ করা এবং কখনও কখনও মরদেহ উদ্ধার করা। তিনি জানান, প্রতিদিনই ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণের মধ্যে কাজ করতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত আতঙ্কজনক।

মোহনের ভাষ্যমতে, ফ্রন্টলাইনে অবস্থানের সময় তিনি একাধিকবার প্রাণঘাতী পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। একবার স্প্লিন্টারের আঘাতে তিনি আহত হন এবং তার সঙ্গে থাকা এক বাংলাদেশি সহকর্মী মাইন বিস্ফোরণে নিহত হন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিয়ে গঠিত ইউনিটে তারা কাজ করতেন, যেখানে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটত বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, রুশ কমান্ডারদের পক্ষ থেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। বেতন আটকে রাখা, প্রতিবাদ করলে মারধর এবং অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয়েছে বলে তিনি জানান। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল মৃত্যুভয়ের মধ্যে কাটানো সময়, এমনটাই তার বর্ণনা।

প্রায় আট মাস যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে মোহন ছুটিতে মস্কো পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় অস্থায়ী ভ্রমণ নথি সংগ্রহ করেন, কারণ তার পাসপোর্ট আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। এরপর নানা জটিলতা পেরিয়ে তিনি বিমানে করে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

দেশে ফিরে মোহন বর্তমানে মুন্সিগঞ্জে পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে যাওয়া তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে কেউ যেন প্রতারিত না হন, সে বিষয়ে তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে অভিবাসন সংক্রান্ত সংস্থা BRAC Migration Programme জানিয়েছে, রাশিয়ায় চাকরির নামে প্রতারণার মাধ্যমে বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। সংস্থাটির মতে, অনেকেই বৈধ ভিসায় গেলেও পরে তাদের জোর করে সামরিক কাজে যুক্ত করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি পরিস্থিতি।

ওমর আলী/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে