ঢাকা, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
Sharenews24

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: জ্বালানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে ঝুঁকি

২০২৬ মার্চ ০২ ১৬:২২:০৮
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: জ্বালানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এখনও বিশ্বের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে লক্ষ্য করে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সংঘাতটি শুধু ওই তিন দেশেই সীমাবদ্ধ নেই; উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও জড়িয়ে পড়ায় পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থাকলেও জ্বালানি, রপ্তানি, আমদানি, শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতার কারণে তার প্রভাব অনুভব করছে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দেখা দিয়েছে জ্বালানি ক্ষেত্রে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো বিপুল তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে। এই জলপথে অনিশ্চয়তা বা অচল অবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়াতে পারে। ইতিমধ্যে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পখাতের অনেকাংশই আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য পরিবর্তনও দেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ বাড়ায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে।

রপ্তানিতেও চাপ বাড়ছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে ইরানে রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ ডলার মূল্যমানের পণ্য, যার মধ্যে পাটের সুতা ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলার, নিট পোশাক ৯৫ হাজার ৩১০ ডলার এবং ওভেন পোশাক ৯ হাজার ৩৫১ ডলার। যদিও পরিমাণ তুলনামূলক কম, তা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব আরও বড় বাজার। শীর্ষ ২০ রপ্তানি বাজারে এ দুটি দেশ রয়েছে। গত অর্থবছরে আমিরাতে রপ্তানি হয়েছে ৩৫ কোটি ডলারের বেশি, সৌদি আরবে ২৯ কোটি ডলারের বেশি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহে ব্যাঘাত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপগামী জাহাজের অনেকটি এই রুট ব্যবহার করে। বিকল্প রুটে গেলে সময় ও খরচ উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখনো কাটেনি। নতুন সংকটের কারণে জরুরি কার্গো ডেলিভারি ব্যাহত হতে পারে। এতে ক্রেতাদের আস্থা নড়বড়ে হতে পারে, এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে।

রেমিট্যান্সও ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমানসহ লাখ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত। যুদ্ধ বিস্তৃত হলে নিরাপত্তা, চাকরি ও আয়ের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। বায়রার সাবেক সভাপতি গোলাম মুস্তাফা বলেছেন, চাকরিচ্যুতি বা ওভারটাইম কমলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমতে পারে, যা রিজার্ভ ও বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি করবে।

কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সংঘাত অনেকটা একপেশি এবং দীর্ঘায়িত নাও হতে পারে। সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শক্তির ভারসাম্য একদিকে বেশি থাকায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, যদি পরিস্থিতি দীর্ঘ হয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিকল্প জ্বালানি উৎস, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং রপ্তানিকারকদের সক্রিয় সমন্বয় জরুরি।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, বাংলাদেশ সরাসরি সংঘাতে না থাকলেও প্রভাব এড়ানো সম্ভব নয়। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে উৎপাদন খরচও বাড়বে। এর প্রভাব রপ্তানির প্রতিযোগিতায় পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাপ তৈরি হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত নীতি-প্রতিক্রিয়া। বাণিজ্য, প্রবাসী কল্যাণ এবং বেসামরিক বিমান চলাচল—সব মন্ত্রণালয় একযোগে কাজ করবে। জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সক্রিয় রাখতে হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আয়ের বিষয়ে দূতাবাসের মাধ্যমে নিবিড় যোগাযোগ রাখা জরুরি। ব্যবসায়ীদেরও ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় জোরদার করতে হবে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে