×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

সিটি গ্রুপকে নতুন করে ১,৭০০ কোটি টাকা দিচ্ছে আট ব্যাংক!

২০২৬ অক্টোবর ২৭ ১১:০০:৩১
সিটি গ্রুপকে নতুন করে ১,৭০০ কোটি টাকা দিচ্ছে আট ব্যাংক!

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে নতুন করে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দিতে যাচ্ছে আটটি ব্যাংক। পাশাপাশি গ্রুপটির আমদানি কার্যক্রম সচল রাখতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে বিশেষ ছাড় চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন ব্যাংকে সিটি গ্রুপের যেসব ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে, সেগুলো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অশ্রেণিকৃত রাখার সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

রমজানের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সিটি গ্রুপের ব্যবসা সচল রাখার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন ঋণ অনুমোদন ও বিশেষ সুবিধা কার্যকরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর জানিয়েছেন, সিটি গ্রুপ ও ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যেসব ব্যাংক গ্রুপটির ঋণ ইতোমধ্যে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করেছে, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ নিয়ে বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে তিনি জানান।

গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ ও সরোয়ার হোসেন এবং সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আটটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারাও অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান, প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল রহমান, ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশিদ, পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণের স্থিতি ছিল ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ছিল ফান্ডেড ঋণ এবং ৭ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা নন-ফান্ডেড ঋণ। পরবর্তী সময়ে গ্রুপটির মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ পরিস্থিতিতে গ্রুপটির চলতি মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে সিন্ডিকেটেড ঋণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিটি ব্যাংক ৩০০ কোটি টাকা এবং অন্য সাতটি ব্যাংক প্রত্যেকে ২০০ কোটি টাকা করে দেবে। সব মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

তবে ঋণদাতা একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, তাঁর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এখনো ঋণটি অনুমোদন করেনি। অনুমোদনের সম্ভাবনা থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ওপর নির্ভর করছে।

নতুন ঋণ দিতে আগ্রহী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করবে। অন্যদিকে, সিন্ডিকেটেড ঋণে অংশ না নেওয়া ব্যাংকগুলো বিদ্যমান ঋণ পুনঃতফসিলের উদ্যোগ নিতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করার প্রয়োজন হবে।

সিটি গ্রুপের ব্যবসা সচল রাখা এবং ভবিষ্যতে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা বাড়ানোর যুক্তিতে কয়েকটি ব্যাংক আগামী ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গ্রুপটির ঋণ অশ্রেণিকৃত রাখার বিশেষ সুবিধা চেয়েছে। এর আগে গ্রুপটি প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ ১২ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করার পাশাপাশি চলতি মূলধন হিসেবে অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকা চেয়েছিল।

ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখাসহ সাত ধরনের নীতিগত সহায়তা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়েছিল সিটি গ্রুপ। পরে ব্যাংকগুলোর সংগঠন এবিবিও একই বিষয়ে চিঠি দেয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক সিটি গ্রুপের ঋণের বিদ্যমান শ্রেণিমান ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার অনুমতি দিয়েছিল। ওই সুবিধার কারণে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত গ্রুপটির প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণের বাইরে ছিল। তবে সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা আর বাড়ানো হয়নি। ফলে গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংকে খেলাপি হয়ে পড়ে এবং নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭ক(৩) ধারায় খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন ঋণ সুবিধা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ কারণে সিটি গ্রুপের যেসব প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়েছে, সেগুলোর নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা পেতে সমস্যা হচ্ছে।

তবে আইনের ১২১ ধারায় সরকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এই আইনি সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিটি গ্রুপকে নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা দেওয়ার অনুমতি চেয়েছে আটটি ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নির্ধারিত শর্ত পূরণ গুরুত্বপূর্ণ।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের ভাষ্য, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং মূল ব্যবসার বাইরে বিনিয়োগের কারণে সিটি গ্রুপ সংকটে পড়েছে। বৈঠকে কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে সংকট থেকে বের করে আনা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন অর্থায়নের অর্থ ও আয় ব্যবস্থাপনার জন্য একটি এসক্রো অ্যাকাউন্ট রাখা হবে। নতুন অর্থায়ন থেকে যে আয় হবে, তা থেকে অর্থ পাবে সংশ্লিষ্ট অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো। অন্য ব্যাংকগুলো ওই অ্যাকাউন্টের অর্থ থেকে সরাসরি অর্থ পাবে না বলে আলোচনায় জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া গ্রুপটির বকেয়া ঋণ পরিশোধের জন্য আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। তবে ঋণের ডাউন পেমেন্টের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানিয়েছেন।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সিটি গ্রুপ খেলাপি হয়ে পড়ায় নতুন অর্থায়নের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাক, তা বাংলাদেশ ব্যাংক চায় না। তবে কোনো ব্যাংককে ঋণ দিতে বাধ্য করা হবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। জামানত নিশ্চিত করতে সিটি গ্রুপকে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে, সিটি গ্রুপের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কার্যক্রম সচল রাখা এবং আসন্ন রমজানের আগে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা না পেলে গ্রুপটির ব্যবসা ব্যাহত হতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোর পাওনা আদায়ও কঠিন হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তবে সিটি গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, ঋণের অনুমোদন এবং ঋণ শ্রেণিকরণে ছাড়ের শর্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টিকে প্রস্তাব ও আলোচনার পর্যায়েই বিবেচনা করতে হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে