×
ঢাকা, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বন্ধ হচ্ছে না শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিএএসএম

২০২৬ অক্টোবর ১৮ ০০:১৪:২৬
বন্ধ হচ্ছে না শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিএএসএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় ওঠার পর অবশেষে শেয়ারবাজারের বিশেষায়িত জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেট’ (বিএএসএম) গুটিয়ে নেওয়ার অবস্থান থেকে পিছু হেঁটেছে এর পরিচালনা পর্ষদ। পর্ষদের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখনই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে না জাতীয় পর্যায়ের এই বিনিয়োগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এর আগে পর্ষদ সভা থেকে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সার্বিক সমালোচনা তৈরি হলে পর্ষদ তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় কমাতে দিলকুশার জীবন বীমা ভবনের বর্তমান কার্যালয়টি মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) ভবনে অবস্থিত ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ) কার্যালয়ে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অফিস ভাড়া ও বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ বাবদ প্রতি মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ হলেও নতুন স্থানে গেলে এই ব্যয়ের বড় অংশই বেঁচে যাবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সিএমএসএফ ভবনে বিএএসএমের যাবতীয় নতুন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. শফিউল আযম স্পষ্ট করেন যে, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থগিত বা বন্ধ করা হচ্ছে না।

বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উল্লেখ করেন, ‘বিনিয়োগ শিক্ষামালা গেজেট’-এর আইনি কাঠামোর আওতায় বিএএসএমকে একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছিল। সরকারি গেজেটের কোথাও এর কার্যক্রম চিরতরে বিলুপ্ত করার কোনো বিধান বা ইচ্ছার উল্লেখ নেই; বরং দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক অগ্রগতির সুরক্ষায় একে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মূল নীতি যেমন দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা, আর্থিক সচেতনতা বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান—এসব কর্মসূচি গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বিএএসএম একটি দক্ষ ‘বাস্তবায়নকারী শাখা’ হিসেবে অবদান রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিকিউরিটিজ কমিশনের প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচিগুলো কোনো সাধারণ একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রশাসনিক জটিলতা এড়িয়ে এবং কাজের সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে এই জরুরি চাহিদা পূরণ করতেই বিএএসএমকে গড়ে তোলা হয়। যদিও 'বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট' (বিআইসিএম) শেয়ারবাজারে উচ্চতর গবেষণা ও একাডেমিক ডিগ্রি প্রদানে কাজ করছে, তথাপি বিএএসএম মূলত বিএসইসির সরাসরি পরিচালনাধীন ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং মাঠপর্যায়ের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মনোযোগ দিয়ে থাকে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে দেশের শেয়ারবাজারের বিভিন্ন পেশাজীবী ও অংশীজনসহ আট হাজারের বেশি প্রশিক্ষণার্থীকে ব্যবহারিক ও পেশাগত ডিগ্রি প্রদান করেছে বিএএসএম। এর নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় যুক্ত ছিলেন সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংক, স্টক ব্রোকার ও ডিলার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক, সিএফও ও কোম্পানি সচিবরা এখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ প্রদান ছাড়াও তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনসচেতনতা বাড়াতে শতাধিক সেমিনার ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে গত এক বছর ধরে বিএএসএমে কোনো স্থায়ী মহাপরিচালক পদায়ন করা হয়নি। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের আমলে প্রতিষ্ঠানটির ওপর নানা অন্যায্য চাপ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ শিক্ষার বদলে টিকটকভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির ওপর তিনি জোর দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির মূল নীতি ব্যাহত হয় এবং এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিশ্বের উন্নত ও বিকাশমান শেয়ারবাজারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি শেয়ারবাজারেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে এমন সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। ফলে সাময়িক আর্থিক বা প্রশাসনিক সংকটকে অজুহাত বানিয়ে এমন একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রাসঙ্গিকতা উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বাজারের টেকসই উন্নয়নে বিএএসএমের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও বাজেট সামর্থ্য আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

বিএএসএমের প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব তুলে ধরে ওয়েবসাইটের বাণীতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান উল্লেখ করেন, সুসংহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা। আর এই প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে সারাদেশে আর্থিক স্বাক্ষরতা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি, যা বাস্তবায়নে বিএএসএম সরকারের প্রধান অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।

সার্বিক বিষয়ে বিএএসএমের বর্তমান মহাপরিচালক ও বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক কামরুল আনাম খান জানান, বোর্ডের সভায় সর্বসম্মতভাবেই বিএএসএমের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীতি হয়েছে এবং আপাতত নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে