×
ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

ন্যাশনাল ব্যাংকের

সব শাখা-এটিএমে অর্থ রাখার ঘোষণা, গ্রাহকদের জন্য নতুন বার্তা

২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১৩:৫৫:১৪
সব শাখা-এটিএমে অর্থ রাখার ঘোষণা, গ্রাহকদের জন্য নতুন বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফেরার উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা চালুর ঘোষণা দিয়েছে ব্যাংকটি। এ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজন হলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত তারল্য সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন এবং ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক। বৈঠকে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, মো. কবির আহমদ, মো. সরোয়ার হোসেন ও মো. আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে গভর্নর আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি গ্রাহকদের আস্থা বজায় রাখা এবং সুশৃঙ্খলভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, ন্যাশনাল ব্যাংকের সব শাখায় সেবা সচল রাখতে প্রাথমিকভাবে ৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা নিয়ে প্রস্তুত থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রয়োজন অনুযায়ী এ সহায়তার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সহায়তার অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে এবং এর গ্যারান্টর হিসেবে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সহায়তার অর্থ ছাড় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের শর্ত কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন জানিয়েছেন, আগামী ১১ অক্টোবর থেকে বড় অঙ্কের আমানতকারীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া শুরু হবে। এরপর ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা রেখে গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর দাবি, কোনো গ্রাহক যাতে টাকা তুলতে এসে খালি হাতে ফিরে না যান, সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও সুশাসনের দুর্বলতার কারণে ন্যাশনাল ব্যাংক পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেনি। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে। ফলে গ্রাহকেরা ঋণপত্র (এলসি) খোলা, চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন, রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) এবং ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি)-এর মতো সেবাগুলো নিতে পারবেন বলে জানান তিনি।

মেলিতা মেহজাবীন আরও বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংক দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক এবং একসময় ব্যাংকটিতে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত ছিল। তাঁর আশা, ১৫ অক্টোবর থেকে সব ধরনের সেবা স্বাভাবিকভাবে পাওয়া গেলে গ্রাহকদের আস্থা বাড়বে এবং তাঁরা আবারও ব্যাংকটিতে আমানত রাখতে উৎসাহিত হবেন।

ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২২১টি শাখা ও ৫৩টি এটিএম বুথ গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হকও জানিয়েছেন, নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আমানতকারীরা যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের অর্থ উত্তোলন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে গভর্নর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমানত ফেরত দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা প্রয়োজন হলে তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

গত মাসে ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবিতে চারজন আমানতকারী হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। এর মধ্যেই ব্যাংকটির আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ বাড়ানো এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সামনে এল।

দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাশনাল ব্যাংক তীব্র তারল্য সংকট ও উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে মোট ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক পেয়েছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এত সহায়তার পরও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার পুরোপুরি উন্নতি হয়নি।

যেভাবে সংকটে পড়ে ন্যাশনাল ব্যাংক

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর গ্রুপটি ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায়। বর্তমানে মাল্টিমোড গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ ও আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগের অনিয়ম, ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকটির সংকটকে আরও গভীর করেছে। গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনে সমস্যা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ খেলাপি, যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান করে।

২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭ টাকা ১০ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে লোকসান ছিল ৯৮৫ কোটি টাকা, আর শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৩ টাকা ৬০ পয়সা।

১৫ অক্টোবর থেকে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর ঘোষণার মধ্য দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে গ্রাহকেরা বাস্তবে কতটা নির্বিঘ্নে আমানত তুলতে পারবেন এবং ধারাবাহিক লোকসান ও খেলাপি ঋণের চাপ কাটিয়ে ব্যাংকটি কতটা দ্রুত স্থিতিশীল হতে পারবে, তা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতির ওপর।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে