×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ারবাজারে অনিয়ম ঠেকাতে আপসহীন হওয়ার আহ্বান

২০২৬ অক্টোবর ০৬ ২১:০৮:০৪
শেয়ারবাজারে অনিয়ম ঠেকাতে আপসহীন হওয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে অনিয়মের ঘটনায় কোনো ধরনের আপস বা ‘গিভ অ্যান্ড টেকিং’-এর পথে হাঁটা হলে এ বাজারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন আল-আমিন। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।

মঙ্গলবার ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন আল-আমিন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি) এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ প্রক্রিয়ার কথা তুলে ধরেন আল-আমিন। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রথমে কোনো একটি শেয়ারের দাম পরিকল্পিতভাবে দ্রুত বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা হয়। এরপর কারসাজিকারীরা বড় পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যান। এ ধরনের কারসাজি দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো বাজারে পড়ে।

তিনি বলেন, শেয়ারের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও সম্পৃক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বড় বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে বেরিয়ে গেলে ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এতে একদিকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে বাজারে তারল্য সংকটও তৈরি হতে পারে।

কোনো শেয়ারের দাম মৌলভিত্তির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কারা ওই শেয়ার কিনছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন নয় বলেও মন্তব্য করেন আল-আমিন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট শেয়ারের লেনদেনের তথ্য ও অন্যান্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলেই কারা কিনছেন এবং কীভাবে লেনদেন হচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন।

বড় অঙ্কের শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু বড় অঙ্কের শেয়ার কেনা হয়েছে—এ কারণে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। বরং কেন শেয়ার কেনা হয়েছে, লেনদেনের উদ্দেশ্য কী এবং এর ধারাবাহিকতা কেমন—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বাইরে থেকে প্রশ্ন তোলার আগে তাদের এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশনের তথ্য পর্যালোচনা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন এই শিক্ষক। তার মতে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিভিন্ন এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশনে কীভাবে অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে, কোন বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসবের বিস্তারিত তথ্য থাকে।

এসব তথ্য পর্যালোচনা না করে শুধু টকশোতে বসে কেন জরিমানা করা হলো বা কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো—এ ধরনের প্রশ্ন তোলা বাজারের জন্য ইতিবাচক নয় বলে মন্তব্য করেন আল-আমিন। তার মতে, এতে অনিয়মের দায় নেওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে ওঠে না।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আর্থিক প্রতিবেদনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আল-আমিন বলেন, কোনো কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা না থাকলে শুধু বিনিয়োগ শিক্ষা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

দেশে বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি ও পণ্যের সংকটকেও শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকার তথ্য তুলে ধরে আল-আমিন বলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৩২টি কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ অবস্থায় ছিল। এর মধ্যে একটি কোম্পানি ২০০২ সাল থেকেই উৎপাদন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ওই কোম্পানির শেয়ারের দাম ১৪ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় উঠেছে।

এ ধরনের ঘটনা শেয়ারবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বাজারের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিনিয়োগযোগ্য ও ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

আল-আমিন বলেন, বাজারে বিনিয়োগের মতো ভালো পণ্য না থাকলে শুধু বিনিয়োগ শিক্ষা দিয়ে মানুষকে শেয়ারবাজারে ধরে রাখা সম্ভব নয়। তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ভালো রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ থাকলে এবং শেয়ারবাজারে প্রতিদিন অস্থিরতা বিরাজ করলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কেন এ বাজারে আসবেন—সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

শেয়ারবাজারকে বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণীর বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়াতে হবে। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি করা সম্ভব হলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও বাজারে আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।

শেয়ারবাজারের অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস না করার আহ্বান জানিয়ে আল-আমিন বলেন, আগের কমিশনও অনিয়মের ক্ষেত্রে ‘গিভ অ্যান্ড টেকিং’-এর পথে যায়নি বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি অনিয়মের সঙ্গে আপস করে, তাহলে শেয়ারবাজারের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে