×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ারবাজারের কারসাজি থামাতে দুর্বল কোম্পানিতে বাড়তি নজরদারির তাগিদ

২০২৬ অক্টোবর ০৬ ১৯:১৬:২৩
শেয়ারবাজারের কারসাজি থামাতে দুর্বল কোম্পানিতে বাড়তি নজরদারির তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে স্বল্প মূলধনী ও মৌলভিত্তিহীন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে অনিয়ম-কারসাজি বন্ধ করতে কড়া তদারকির তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। তাঁর মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এসব কোম্পানির লেনদেনে বাড়তি কড়াকড়ি ও বিধিনিষেধ চালু করা গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে পূর্বেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবেন।

মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিশেষ সেমিনারে অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা জানান। সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি)।

মমিনুল ইসলাম উল্লেখ করেন, দেশের শেয়ারবাজারে ঋণের ব্যবহার কম হলেও ক্ষুদ্র মূলধনী ও দুর্বল ভিত্তির প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। এর পাশাপাশি বাজারের সিংহভাগজুড়ে রয়েছেন অনভিজ্ঞ খুচরা বিনিয়োগকারী। ফলে বাজারে অনিয়মকারীদের কারসাজি করার পথ সুগম হয় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকির মাত্রা বাড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে বাজারের গতিপ্রকৃতি বা শেয়ারের দাম না বুঝে কেবল দেখাদেখি বিনিয়োগ করার প্রবণতা দেখা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, অনেকেই একদম চড়া দামে এসব শেয়ার কিনে পরবর্তীতে দরপতনের মুখে পড়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার হন।

ডিএসই প্রধান প্রস্তাব করেন, স্বল্প মূলধনী ও দুর্বল শেয়ারগুলোকে পৃথক ক্যাটাগরিতে নিয়ে এসে তাদের লেনদেনে বাড়তি নজরদারি ও কঠোর নিয়ম চালু করা দরকার। এর মাধ্যমে কোনো শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা আগেই সসংকেত বা সতর্কবার্তা পেয়ে যাবেন।

আর্থিক বিশ্লেষকের অভাব বড় প্রতিবন্ধকতা

বাজারে নিবন্ধিত পেশাদার আর্থিক বিশ্লেষকের ব্যাপক শূন্যতা রয়েছে উল্লেখ করে মমিনুল ইসলাম বলেন, কোনো শেয়ার কেনা, ধরে রাখা নাকি বিক্রি করা উচিত—সে বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে। নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণের ব্যবস্থা থাকলে বিনিয়োগকারীরা সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।

তিনি মনে করেন, বাজারে যোগ্য ও নিবন্ধিত বিশ্লেষক থাকলে তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়বে। এতে করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে ফায়দা লোটা সুযোগসন্ধানীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে টেকসই করতে ভালো মানের ও শক্ত ভিত্তির কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার জোর তাগিদ দেন তিনি। তিনি জানান, বাজারে বহুমুখী পণ্য ও ভালো প্রতিষ্ঠান এলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে, যা অযৌক্তিক অস্থিরতা কমিয়ে আনবে।

প্রতারণা ঠেকাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার

ডিএসই চেয়ারম্যান সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অসংযত ব্যবহারের ফলে অনলাইনে পরিচয় গোপন করে প্রতারણા বহুগুণ বেড়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও মেসেজিং অ্যাপে বিএসইসির লোগো ব্যবহার করে অবৈধ গ্রুপ চালানো হচ্ছে।

এসব চক্র নিজেদের অনুমোদিত আর্থিক উপদেষ্টা দাবি করে বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই রাতারাতি টাকা দ্বিগুণ করার লোভনীয় প্রস্তাব দিচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

গত বছরে বিএসইসির নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা নারায়ণগঞ্জের একটি চক্রসহ একাধিক ভুয়া গ্রুপ শনাক্ত করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্যগতভাবে স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি শুধু ব্রোকার, ইস্যুয়ার ও মূল লেনদেন কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই নজরদারির সীমানা আরও বিস্তৃত করা জরুরি।

প্রযুক্তিভিত্তিক কারসাজি ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতারণাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে এখন থেকেই এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দক্ষ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব

শেয়ারবাজারে বিশ্বস্ত ও দক্ষ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন মমিনুল ইসলাম। তাঁর মতে, শক্ত ভিত্তির ব্রোকারেজ হাউস, পোর্টফোলিও ম্যানেজার ও মিউচুয়াল ফান্ড ফান্ড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।

নির্ভরযোগ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়লে সাধারণ মানুষ আর অসৎ চক্রের চটকদার কিংবা অবাস্তব মুনাফার প্রলোভনে কান দেবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তাই শেয়ারবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করাকে ডিএসইর প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

পরিশেষে তিনি জানান, শেয়ারবাজারের সার্বিক উন্নয়নে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জ সম্মিলিতভাবে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একটি স্বচ্ছ, নিরাপদ ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে