×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়নে বড় ধাক্কা, চার মাসে গেল মাত্র ১১০ কোটি

২০২৬ অক্টোবর ০১ ১৭:২৮:০১
২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়নে বড় ধাক্কা, চার মাসে গেল মাত্র ১১০ কোটি

নিজস্ব প্রতিবেদক:বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা ও সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। স্কিম ঘোষণার প্রায় চার মাস পরও এ তহবিল থেকে ঋণ ছাড় হয়েছে মাত্র ১১০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কিমটির আওতায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা পড়লেও মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়েছে।

চলতি বছরের জুনে চালু হওয়া এই স্কিমের ধীরগতির পেছনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি নেওয়ার অনীহাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংক কম সুদে তহবিল সরবরাহ করলেও ঋণের ক্রেডিট ঝুঁকি মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেই বহন করতে হচ্ছে। ফলে বন্ধ বা দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সক্ষমতা নিয়ে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে।

স্কিমের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণপ্রত্যাশী প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এরপর ব্যাংক নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে যোগ্য আবেদনগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সস্তা তহবিল পাওয়ার সুযোগ থাকলেও চূড়ান্ত ঋণঝুঁকি বহন করতে হয় বাণিজ্যিক ব্যাংককে।

এদিকে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, তাদের যাচাই ও অডিট প্রক্রিয়া শেষে প্রায় ২০০টি পোশাক কারখানাকে এই স্কিমের জন্য প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছিল। তবে সংগঠনটির দাবি, এখন পর্যন্ত এসব কারখানার কোনোটি এই তহবিল থেকে অর্থ পায়নি।

বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, তাদের জানা মতে এখন পর্যন্ত এই স্কিমের আওতায় কোনো কারখানা অর্থ পায়নি। একইভাবে কয়েকজন কারখানা মালিকও জানিয়েছেন, তারা আবেদন করার পরও অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।

২০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিলটি মূলত বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি এই স্কিমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ নিয়ে চূড়ান্ত ঋণগ্রহীতাকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারে। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরুর আগে ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছে। তহবিলের প্রাপ্যতা ও ঋণগ্রহীতার কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে ঋণ নবায়নযোগ্য এবং এর মেয়াদ এক বছর। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের জন্য সর্বোচ্চ ঋণের সীমা ২০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে ধীরগতি ইচ্ছাকৃত এবং প্রয়োজনীয়। তাঁর মতে, বন্ধ কারখানায় অর্থায়ন বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য একটি নতুন ও অপরীক্ষিত মডেল। জনগণের আমানতের অর্থ জড়িত থাকায় আবেদনকারীদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও ঝুঁকি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে সময় লাগছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত নয়—এমন প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধা দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

ব্যাংকাররা বলছেন, কম সুদের অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বন্ধ কারখানায় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ঋণের ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ব্যালান্সশিটেই আসে। বাস্তবসম্মতভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা ছাড়া বন্ধ কারখানায় আমানতকারীদের অর্থ বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ।

কিছু ব্যাংক নতুন অর্থায়নের আগে সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যালান্সশিট পুনর্গঠনের শর্ত দিচ্ছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত জামানত দেওয়া, সম্পদ বিক্রি করে পুরোনো দায় পরিশোধ এবং নতুন ইকুইটি বা মূলধন আনার মতো পদক্ষেপ রয়েছে।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন জানান, তাদের ব্যাংক কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণপ্রস্তাব তৈরি করেছে। তবে নতুন ঋণ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত জামানত দেওয়া অথবা নিজেদের সম্পদ বিক্রি করে বিদ্যমান দায় সমন্বয়ের শর্ত দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি ও বেঙ্গল প্লাস্টিকের উদাহরণ দিয়ে জানান, সম্পদ বিক্রি এবং নতুন ইকুইটি যুক্ত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যালান্সশিট শক্তিশালী করার পর ব্যাংক থেকে তুলনামূলক কম খরচে পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোরও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এদিকে পোশাকশিল্পের মালিকরা বলছেন, দ্রুত অর্থায়ন না হলে কিছু প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে।

ঢাকার নওফস গার্মেন্টস লিমিটেড দুই মাস আগে উত্তরা ব্যাংকের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করলেও এখনো অনুমোদন পায়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর ইসলাম বলেন, ঋণ ছাড় না হলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

চট্টগ্রামের ক্লাসিক্যাল ফ্যাশন লিমিটেডও পুনঃঅর্থায়নের জন্য আবেদন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৬৫০ থেকে কমে ১৫০ জনে নেমেছে। ৪৫০টি সেলাই মেশিনের মধ্যে বর্তমানে ১২০টি চালু রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই কারখানাটিকে আবার পূর্ণ সক্ষমতায় নেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার ১৫টি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সামগ্রিক চিত্রেও আবেদন ও বিতরণের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব তহবিলে মোট ৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছে এবং বিভিন্ন স্কিমের আওতায় বিতরণ হয়েছে ৬ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৃহত্তর প্রণোদনা প্যাকেজের লক্ষ্য ছিল বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা, রপ্তানি কার্যক্রম সচল করা এবং স্বল্প সুদের অর্থায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো। তবে ২০ হাজার কোটি টাকার এই নির্দিষ্ট স্কিমে অর্থ ছাড়ের ধীরগতি এখন ব্যাংকের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা, ঋণগ্রহীতার আর্থিক পুনর্গঠন এবং পুনরায় ব্যবসা চালুর বাস্তব সম্ভাবনা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে