×
ঢাকা, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘জয় বাংলা’ স্লোগান, জাসদ অফিস থেকে আটক ২৬০

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৬ ২২:৩৮:২২
‘জয় বাংলা’ স্লোগান, জাসদ অফিস থেকে আটক ২৬০

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের (ইনু) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক চলাকালে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সন্দেহে ২৬০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কার্যালয়ের ভেতর থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনার পর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকাররা ভবনটি ঘিরে ফেলেন। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান শুরু করে এবং প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর আটক ব্যক্তিদের পল্টন ও শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। তারা ভবনটির চারপাশে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। মানুষের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে পুলিশ সড়কের এক পাশের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

অভিযানের সময় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যও আটক হন। জাসদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ তাকে গাড়িতে তোলার সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা বৈঠকে তার অংশগ্রহণের কারণ জানতে চাইলে তিনি তখন কোনো উত্তর দেননি। পরে আটক অবস্থায় নিজের ফেসবুক পোস্টে সূর্য দাবি করেন, তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে সেখানে গিয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকাল ১০টার দিকে শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ের ৩৫ নম্বর ভবন, হোটেল গ্যানিস ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত কর্নেল তাহের মিলনায়তনে লোকজন আসতে শুরু করেন। তারা একসঙ্গে না এসে দুই-তিনজন করে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তাদের কয়েকজন আশপাশের বিভিন্ন হোটেলে খাবারও খান।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কার্যালয়ের ভেতরে সভা শুরু হয়। একপর্যায়ে ভেতর থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনা যায় বলে জানান স্থানীয় হকার ও ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি জানতে তারা দ্বিতীয় তলায় গেলে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েকবার দরজায় নক করেও কোনো সাড়া না পাওয়ার পর একপর্যায়ে দরজা খোলা হয়। তখন ভেতরে চার শতাধিক মানুষকে দেখে তারা বিস্মিত হন।

এ সময় উপস্থিত লোকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরিস্থিতির মধ্যে কয়েকজন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চলে যান। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন ভবনের বাইরের কলাপসিবল গেট বন্ধ করে পুলিশকে খবর দেন।

খবর পেয়ে পুলিশ পুরো ভবন ঘিরে ফেলে। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অভিযান শেষে আটক ব্যক্তিদের পাঁচটি প্রিজনভ্যানে করে থানায় নেওয়া হয়। পল্টন থানায় তাদের সবাইকে রাখার মতো জায়গা না থাকায় কয়েকজনকে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়।

সরেজমিনে যা দেখা গেল

শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের ডান পাশের অংশে যান চলাচল বন্ধ করে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছে। গাড়িগুলোকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভবনের সামনে মানুষের ভিড়ও দেখা যায়। অভিযানের সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।

জাসদ কার্যালয়ের পাশেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় রয়েছে। সংবেদনশীল এই এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ও বৈঠককে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী, হকার এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। এ ঘটনার পেছনে কারও ইন্ধন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান কয়েকজন।

স্থানীয় কাপড় ব্যবসায়ী সবুজ জানান, জাসদ কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে লোকজনের যাতায়াত ছিল। শনিবার হকার ও ব্যবসায়ীরা প্রথমে দ্বিতীয় তলায় গেলে সেখানে থাকা অনেককে দ্রুত সরে যেতে দেখা যায়।

শাহবাগ থানা বিএনপির কর্মী শরিফের দাবি, জাসদ কার্যালয়ের মিলনায়তনে পাঁচ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। পরে সুযোগ বুঝে তাদের অনেকে সেখান থেকে বের হয়ে যান। তিনি তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

পুলিশ জানিয়েছে, বৈঠকে কোনো ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

পল্টন থানায় গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। তাদের অতীত রেকর্ড বা ট্র্যাক রেকর্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানাগুলো থেকে তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে।

আটক ব্যক্তিদের পল্টন থানার বিভিন্ন কক্ষে রাখা হয়েছে। তাদের অনেকের কাছেই মোবাইল ফোন রয়েছে এবং তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। থানার লকআপে একসঙ্গে বেশি মানুষ রাখার সুযোগ না থাকায় আপাতত তাদের এভাবে রাখা হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান।

জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়েছেন—এমন অভিযোগ তুলে যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং পল্টন থানা যুবদলের নেতাকর্মীরা কার্যালয়টি ঘিরে অবস্থান নেন। নয়নের নেতৃত্বে সেখানে বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা একাধিক মিছিল বের করেন।

রবিউল ইসলাম নয়ন সাংবাদিকদের বলেন, বিদেশে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিচ্ছেন। তার দাবি, জাসদ কার্যালয়ের ওই বৈঠকে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, তা পুলিশকে তদন্ত করে দেখতে হবে। আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যেন ঢাকার কোথাও মিছিল-মিটিং করতে না পারে, সে বিষয়ে ঢাকা মহানগর যুবদলের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শাহবাগ থানা যুবদলের সদস্য সচিব মোয়াজ্জেম হোসেন তপনের দাবি, কুষ্টিয়া, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এনে সেখানে বৈঠক করা হচ্ছিল। তার অভিযোগ, দেশে জ্বালাও-পোড়াও করার উদ্দেশ্যেই ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।

অভিযানের সময় আটক ব্যক্তিদের স্বজনদেরও জাসদ কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে দেখা যায়। স্নিগ্ধা নামের এক তরুণী নিজেকে এনসিপির গুলশান থানার নেত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জানান, তার বাবা রুহুল আমিনের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায়। তিনি আগে জাসদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তবে বর্তমানে জাসদ করেন না। শনিবার ঢাকায় আসার পর তাকে জাসদ কার্যালয় থেকে আটক করা হয়েছে বলে ফোনে পরিবারের সদস্যদের জানান। পরে বাবার খোঁজ নিতে তিনি ঘটনাস্থলে আসেন। তবে পুলিশ তাকে কোনো তথ্য দেয়নি বলে দাবি করেন তিনি। পরে তিনি পল্টন থানায় যান।

ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের ডিসি মো. আকতার হোসেন জানান, জাসদ কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এবং সেখানে বৈঠক চলছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়।

পল্টন থানার ওসি আরিফুর ইসলাম জানান, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তাদের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

তবে জাসদের পক্ষ থেকে ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। দলটির দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, শনিবার সকালে জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৪০০ নেতাকর্মী এতে অংশ নেন। সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়।

তার দাবি, সভা চলাকালে প্রথমে বিএনপির নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে জাসদের নেতাকর্মীদের মারধর করেন। ঘটনাস্থলে তখন পুলিশ সদস্যরাও ছিলেন। পরে বিকেলে পুলিশ এসে একে একে নেতাকর্মীদের আটক করতে শুরু করে। তাদের কেউই কার্যালয় থেকে বের হতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।

জাসদের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিনিধি সভা আয়োজন, মাইক ব্যবহার ও নিরাপত্তার জন্য পুলিশের কাছে আগেই আবেদন করা হয়েছিল। দলটির দাবি অনুযায়ী, গত ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এবং ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসির কাছে এ বিষয়ে আবেদন করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি চিঠিও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি। তবে ওই আবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ কোনো অনুমতি দিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, গত ৩০ জুন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। মামলায় তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং প্রতিটি অভিযোগে তাকে ১০ বছর করে সাজা দেওয়া হয়।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে