×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজমিস্ত্রি থেকে রিকশাচালক—তারপর ‘হ্যাকিং গুরু’! 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৪ ০৯:৪২:১৭
রাজমিস্ত্রি থেকে রিকশাচালক—তারপর ‘হ্যাকিং গুরু’! 

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে দিনমজুর, এরপর রিকশাচালক—জীবিকার পথ বদলাতে বদলাতে একসময় হ্যাকিংয়ে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে নাটোরের লালপুরের ওহিদুল মোল্লার বিরুদ্ধে। পুলিশের দাবি, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে হ্যাকিং কার্যক্রমের পাশাপাশি মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পান ‘হ্যাকিং গুরু’ হিসেবে।

ওহিদুল মোল্লার বয়স ৩২ বছর। তিনি লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের মৃত রাব্বেল মোল্লার ছেলে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবার মৃত্যুর পর আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর লেখাপড়া আর এগোয়নি। মাদ্রাসার পড়াশোনা ছেড়ে প্রথমে দিনমজুর এবং পরে রিকশা চালানোর কাজ শুরু করেন তিনি।

ওহিদুলের চাচাতো ভাই সেন্টু মোল্লার দাবি, প্রায় পাঁচ বছর আগে হঠাৎ রিকশা চালানো ছেড়ে দেন ওহিদুল। এরপর স্থানীয় কয়েকজন হ্যাকারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে তিনি হ্যাকিংয়ের বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

পুলিশের দাবি, পরবর্তী সময়ে ওহিদুলের তত্ত্বাবধানে একটি হ্যাকিং চক্র গড়ে ওঠে। হ্যাকিংয়ের পাশাপাশি মাদক ব্যবসার সঙ্গেও তিনি যুক্ত হন বলে পুলিশের অভিযোগ। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অল্প সময়ে তাঁর জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওহিদুলের পৈতৃক বাড়ির পাশাপাশি বিলমাড়িয়া এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে আরেকটি পাকা বাড়ি রয়েছে। সেখানে মহিষ ও কবুতরের খামারও গড়ে তোলেন তিনি।

বাড়িটি উঁচু ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং প্রবেশের জন্য একটি ফটক রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে সাধারণ মানুষের চলাচল খুব বেশি না থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত তরুণদের যাতায়াত দেখা যেত।

পুলিশের দাবি, ওই বাড়ির কবুতরের খামারের একটি কক্ষকে হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হতো। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ওই কক্ষে স্মার্ট মনিটর, ওয়াই-ফাই সংযোগ ও অন্যান্য সরঞ্জাম ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওহিদুল নিজের বাড়ি থেকে গ্রামের প্রধান সড়ক পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন। পুলিশের গতিবিধি সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়ার জন্যও এসব ক্যামেরা ব্যবহার করা হতো বলে পুলিশের দাবি। তবে স্থানীয়দের কাছে ক্যামেরা বসানোর কারণ হিসেবে ওহিদুল কবুতর ও মহিষ চুরি ঠেকানোর কথা বলতেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

পুলিশ আরও দাবি করেছে, হ্যাকিং কার্যক্রমে সাতটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করা হতো এবং সেগুলোর মধ্যে ৬৮টি সিম কার্ড অদলবদল করে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছে। সিমগুলোর নম্বর কাগজে ছকের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা ছিল বলেও পুলিশ জানিয়েছে।এ ছাড়া বিকাশ, নগদ ও রকেটের লেনদেনের হিসাব রাখার ক্ষেত্রেও সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, গোপন কক্ষটি ব্যবহার করে অন্যের মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। একই সঙ্গে সেখানে মাদক ব্যবসার কার্যক্রমও পরিচালিত হতো বলে পুলিশের অভিযোগ।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যেই ওহিদুলের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে। তিনি দামি মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন। রাজশাহী ও পাবনায় যাতায়াতের সময় কখনো কখনো দামি গাড়ি ভাড়া করতেন বলেও স্থানীয় এক চালক দাবি করেছেন।

তবে এসব অর্থ-সম্পদের উৎস এবং হ্যাকিং ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।

লালপুর থানা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সোমবার দিবাগত রাতে মোহরকয়া গ্রামে ওহিদুলের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে কবুতরের খামারের কথিত গোপন কক্ষ থেকে ওহিদুলসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারদের মধ্যে আলামিন নামে ২৩ বছর বয়সী রাজশাহী রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) এক পুলিশ কনস্টেবলও রয়েছেন। তিনি লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের পানসিপাড়া গ্রামের আতাহার প্রামাণিকের ছেলে।আলামিনের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আরআরএফ রাজশাহীর কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত ডিআইজি) দীন মোহাম্মদ।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানের সময় গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ১০৬টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসার অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।

মামলায় ওহিদুলসহ ছয়জনকে আদালতে হাজির করা হলে লালপুর আমলি আদালতের বিচারক সাদ্দাম হোসেন তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে রাত ৯টার দিকে তাঁদের নাটোর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ওহিদুলের কাছ থেকে আশপাশের অনেক মানুষ হ্যাকিং শিখে এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নানা কৌশল অবলম্বন করলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে ধরা পড়েন।

পুলিশের দাবি, ঘটনাটি তদন্ত করে হ্যাকিং কার্যক্রমের সঙ্গে কারা জড়িত এবং কীভাবে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে