ঢাকা, রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

৩৮৬৪ এমএফএস হিসাব দিয়ে দেশে দিনে ৩৫ নতুন জুয়ার সাইট!

২০২৬ আগস্ট ১৬ ১০:৫৫:৫৩
৩৮৬৪ এমএফএস হিসাব দিয়ে দেশে দিনে ৩৫ নতুন জুয়ার সাইট!

নিজস্ব প্রতিবেদক: একটি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন নামে আরেকটি সাইট চালু হচ্ছে। কোনো অ্যাপ সরিয়ে দেওয়া হলেও ভিন্ন নামে আবারও শুরু হচ্ছে কার্যক্রম। প্রযুক্তির এই ফাঁক কাজে লাগিয়ে দেশে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি নতুন অনলাইন জুয়ার সাইট চালু হচ্ছে। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) তথ্য বলছে, গত ১ মে থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ৫৮৬টি অনলাইন জুয়ার সাইট সক্রিয় ছিল।

এসব সাইটে জুয়ার লেনদেনে ব্যবহার করা হচ্ছে ৩ হাজার ৮৬৪টি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাব এবং ১৯৮টি ব্যাংক হিসাব। পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব হিসাবের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।

আজকের পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়ার লেনদেনের বড় একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে। অনেক জুয়ার সাইট ও অ্যাপ দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অনলাইন জুয়ার বেশির ভাগ সাইট রাশিয়া, চীন, হংকং, ভিয়েতনাম ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিচালিত হয়। দেশে এসব চক্রের এজেন্ট ও সাব-এজেন্ট রয়েছে। তারা এমএফএস, ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে জুয়ার অর্থ সংগ্রহ করে পরে তা বিদেশে পাচার করে।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের তদন্তে এমন একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। গত ৬ মে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ থেকে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৭ মে নরসিংদী ও ঢাকার ধানমণ্ডি থেকে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ, সজীব চক্রবর্তী, আশরাফুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, তৈয়ব খান, সৌমিক সাহা, মো. কামরুজ্জামান ও আবদুর রহমান।

এ ঘটনায় রাজধানীর পল্টন থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মামলা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সিআইডির দাবি, ওই চক্র চারটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা করছিল। এসব ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়াভিত্তিক একটি চক্রের হাতে ছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তে চক্রটির মাধ্যমে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে সিআইডি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। চক্রটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো ওয়ালেট শনাক্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো এমএফএস হিসাব থেকে ৩০ হাজার থেকে ৫ লাখ বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। কিছু এজেন্ট নম্বরে এর চেয়েও বেশি অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

জুয়ার চক্রগুলো বিভিন্ন এমএফএস প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এজেন্ট নম্বর সংগ্রহ করছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। আবার কেউ কেউ দৈনিক ভিত্তিতে এজেন্ট নম্বর ভাড়া নিয়ে জুয়ার টাকা সংগ্রহ করছে।

গত ৮ জুন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী থেকে মোস্তাক মিয়া নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বিকাশ ও নগদের এজেন্ট ব্যবসা রয়েছে। পুলিশের দাবি, ওই ব্যবসার আড়ালে ১০ থেকে ১১টি অনলাইন জুয়ার সাইটের অর্থ তাঁর নম্বরে লেনদেন হতো। বিনিময়ে তিনি কমিশন পেতেন।

অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫ হাজার ১০৯টি জুয়ার ওয়েবসাইট ও ৪৫০টি অ্যাপ বন্ধ করেছে সংস্থাটি।

সিআইডির সিপিসি ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাইফউদ্দীন শাহীন জানিয়েছেন, সাইবার প্যাট্রল টিম নিয়মিত জুয়ার সাইটগুলো পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিদিন শনাক্ত হওয়া সাইট বন্ধের জন্য বিটিআরসিকে তালিকা দেওয়া হয়। সক্রিয় ৫৮৬টি জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধের জন্যও তালিকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এমএফএস হিসাবের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো ব্যবহারকারী জুয়ার সাইট বা অ্যাপে মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধনের পর নির্দিষ্ট এমএফএস নম্বর বা ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠিয়ে জুয়ার অ্যাকাউন্টে অর্থ যোগ করেন। জিতলে একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকে।

ফলে শুধু ওয়েবসাইট বা অ্যাপ বন্ধ করে পুরো চক্র ভেঙে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে জড়িত ব্যবহারকারী, এজেন্ট, আর্থিক হিসাব এবং অর্থের গন্তব্য শনাক্ত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রায় ৫৫ হাজার এমএফএস হিসাবের লেনদেন স্থগিত বা ফ্রিজ করা হয়েছে।

প্রযুক্তিবিদ ও আইনজীবী তানভীর হাসান জোহা বলেন, একটি সাইট বন্ধ করার পর অপরাধীরা নতুন সাইট নিয়ে ফিরে আসতে পারে। তাই শুধু সাইট বা অ্যাপ বন্ধ না করে ব্যবহারকারী, এজেন্ট, এমএফএস, ব্যাংক হিসাব এবং অর্থের গন্তব্য—পুরো চেইনকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে অনলাইন জুয়ার নেপথ্যের মূল হোতাদের শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। তবে এ ধরনের তদন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল হওয়ায় মামলার অগ্রগতি ধীর হতে পারে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে