ঢাকা, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

ডিবি হারুনকে সরানো নিয়ে কাদের-কামালের ফোনালাপে যে কথা হয়

২০২৬ আগস্ট ১২ ১৫:৪৬:৪৭
ডিবি হারুনকে সরানো নিয়ে কাদের-কামালের ফোনালাপে যে কথা হয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: ডিবির সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের একটি ফোনালাপের প্রতিলিপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ডিবি কার্যালয়ে খাবার খাওয়ানো, ছবি তোলা এবং তা গণমাধ্যমে প্রকাশের বিষয়েও হারুন ও ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথনের একটি অডিও কলের প্রতিলিপি আদালতে প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে।

বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এসব অডিও কথোপকথনের প্রতিলিপি উপস্থাপন করা হয়।

ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল মামলাটির শুনানি করছেন।

সমন্বয়কদের খাবার ও ছবি তোলা নিয়ে হারুনের দাবিট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত ওবায়দুল কাদের ও হারুন অর রশীদের কথোপকথনে সমন্বয়কদের ডিবি কার্যালয়ে খাবার খাওয়ানোর ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে শোনা যায়।

কথোপকথনে হারুন দাবি করেন, সমন্বয়কদের খাবার খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

ওবায়দুল কাদের কথোপকথনের একপর্যায়ে জানতে চান, খাবার খাওয়ানোর পর ছবি তুলে সেগুলো বাইরে প্রকাশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না। জবাবে হারুন জানান, ছবি তোলা এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের জন্য তা পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল বলেও কথোপকথনে উল্লেখ করেন হারুন।

হারুন আরও দাবি করেন, তিনি যা করেছেন তা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির নির্দেশ অনুযায়ী করেছেন। নিজের সিদ্ধান্তে এর বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেননি বলেও তিনি ওবায়দুল কাদেরকে জানান। এ বিষয়ে প্রমাণ সংগ্রহের জন্যও তিনি কাদেরের সহযোগিতা চান।

কথোপকথনের একপর্যায়ে হারুন নিজের পদ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, ওই ঘটনার পর তাকে ডিবির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ সময় নিজের অপরাধ কী—ওবায়দুল কাদেরের কাছে তা জানতে চান হারুন। তার বক্তব্যের মধ্যে নিজের ওপর নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয়টি উঠে আসে।

এদিকে হারুন অর রশীদকে ডিবির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের আরেকটি ফোনালাপের প্রতিলিপিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ওই কথোপকথনে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, হারুনকে পুলিশের বাইরে পাঠানো হবে না। তাকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-এর মধ্যেই রাখা হবে, তবে তার দায়িত্ব পরিবর্তন করা হবে।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, হারুনকে অন্য কোথাও দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ডিএমপির মধ্যেই রেখে শুধু গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

হারুনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ওবায়দুল কাদের পুলিশের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কথোপকথনে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এমন সিদ্ধান্ত পুলিশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে এবং বাহিনীর মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

জবাবে আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও পুলিশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনার কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি জানান, হারুনকে ডিবির দায়িত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে।

ফোনালাপে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী হারুনকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশ দেওয়ার পরই তার দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, হারুনের দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি তাকে কয়েক দিন ধরে করতে বলা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর হারুনের দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

এরপর ওবায়দুল কাদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি জানিয়ে সিদ্ধান্তটি পুনরায় বিবেচনার অনুরোধ করার কথা বলেন।

জবাবে কামাল জানান, তিনি ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়ার পরই হারুনের দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের সাত নেতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলাটি চলছে।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন। পরে ২ আগস্ট মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।

বর্তমানে মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর্যায় চলছে। এই পর্যায়েই প্রসিকিউশন হারুন অর রশীদ ও ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথন এবং হারুনকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের ফোনালাপের প্রতিলিপি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে